আবু হেনা মোস্তফা জামান
কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরিবার থেকে হারিয়ে যান শিরিন খাতুন ও অন্তরা বেগম নামের দুই কিশোরী। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনহীন এই দুই নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে রংপুর আদালতের নির্দেশে ২০১০ সালে রাজশাহী পবা সেফ হোমে আশ্রয় পান।
সেখানেই কেটে যায় জীবনের ১১টি বছর। প্রায় এক যুগ পর বিয়ের মাধ্যমে তারা নতুন জীবনে পা বাড়ালেন। এক পিঁড়িতে দুই কন্যা অন্তরা বেগম ফজিলা (৩৩) ও শিরিনা খাতুন (৩৩) এর বিয়ে।
গত শুক্রবার (১৯ নভেম্বর) ধুমধামে তাদের বিয়ের আয়োজন করে রাজশাহী সমাজসেবা অধিদফতরের আওতাধীন সেফহোম কর্তৃপক্ষ।
বিয়েবাড়িতে দাওয়াত খেতে এলেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ইউএনও, ম্যাজিস্ট্রেট, সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মকর্তাসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সেফহোমে বিয়ের আসরের মোনাজাত শেষে ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল বলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিয়ের ব্যবস্থা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার জন্য রংপুর ও পঞ্চগড় আদালতে তাদের জামিন নিতে হয়।
বিয়েতে দুই পক্ষের অতিথিসহ প্রায় ৩০০ মানুষকে দাওয়াত করা হয়েছিল। শিরিন খাতুনের বর পবার পিল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন (৫০)। তিনি রাজশাহী নগরীতে অটোরিকশা চালান। তিন বছর আগে তার স্ত্রী মারা যান। বিয়েতে দেনমোহর এক লাখ টাকা। এক হাজার টাকা নগদে বিয়ে পড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে অন্তরা বেগমকে বিয়ে করেছেন নগরীর বড় বনগ্রাম দুরুলের মোড় এলাকার বাসিন্দা মো. বিপ্লব (৪২)। তার বিয়ের দেনমোহর দুই লাখ টাকা। এর মধ্যে নগদ এক হাজার টাকায় বিয়ে পড়ানো হয়েছে।
বর বিপ্লবের গরু-ছাগলের ব্যবসা রয়েছে। ১২ বছর আগে তার স্ত্রী মারা যান। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি। বাবার বিয়ের বরযাত্রী হয়ে এসেছে তারা। স্বামীর সন্তানদের নিজের সন্তানের মতোই আগলে রাখার প্রত্যাশা অন্তরা বেগমের।
সেফাহোমের উপতত্ত্বাবধায়ক লাইজু রাজ্জাক বলেন, রংপুর আদালতের মাধ্যমে ২০১০ সালে সেফহোমে এসেছিলেন শিরিন খাতুন। একই বছর অন্তরা বেগমকে সেফহোমে পাঠান পঞ্চগড় আদালত। ঠিকানা বলতে না পারায় তাদের পরিবারে পাঠানো সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, এখানে তাদের কেটে গেছে ১১ বছর।
তাদের বয়স এখন প্রায় ৩৩ বছর। তাদের বয়সও বেড়ে যাচ্ছে। এই বিবেচনায় বিয়ের জন্য এলাকায় ঘটক পাঠান। পেয়ে যান দু’জন পাত্র। দেখাশোনার পর অন্তরা ও শিরিনা তাদের বরকে পছন্দ করে বিয়ে করতে রাজি হন।
লাইজু রাজ্জাক আরও বলেন, অন্তরা বেগম ও শিরিন খাতুনের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর বিষয়টি তিনি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির সভায় তোলেন। কমিটির সভাপতি রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিয়ের ব্যবস্থা করার অনুমতি দেন।
পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে মাসখানেক সময় লেগে যায়। তারপর শুরু হয় ঘটা করে বিয়ের আয়োজন। জামাই আদরের কোনো কমতিই রাখেননি সেফাহোমের উপতত্ত্বাবধায়ক। দুই মেয়ের বিদায়বেলায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তারা নিজের সংসারে সুখে থাকবেন এটাই তার আনন্দ।
সেফহোমের ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল বলেন, শিরিনা খাতুন ও অন্তরা বেগম পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। বিয়েতে নিজেরা খুশি বলে জানিয়েছেন তারা। অভিভাবকহীন দুই নারীর বিয়ে দিতে পারাটাও আমাদের কাছে আনন্দের।
