আলো ডেস্ক:
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশে অস্থিরতা বিরাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক এবং প্রতিনিয়ত একের পর এক ঘটছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম আট মাস ধরে স্থবির হয়ে আছে। এ সময়ে তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। কিন্তু কমিশন না থাকায় সংস্থাটির কর্মকর্তারা অভিযোগগুলো তদন্ত করে কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারছে না। অথচ আইন অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা হবে এবং এর স্থায়ী ধারাবাহিকতা থাকবে। চেয়ারম্যানের সঙ্গে সদস্য হিসেবে থাকবেন সর্বোচ্চ ছয়জন। একজন সার্বক্ষণিক সদস্য থাকবেন। চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে সার্বক্ষণিক সদস্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের অধীনস্থ সংস্থা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, সার্বক্ষণিক সদস্য ও কমিশনের অন্য সদস্যরা গত বছরের নভেম্বরে পদত্যাগ করেন। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, সার্বক্ষণিক সদস্য ও কমিশন সদস্যের পদ ফাঁকা পড়ে আছে। কমিশনের পদত্যাগের দিন থেকে গত জুন পর্যন্ত তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। কিন্তু কমিশন শূন্য থাকায় সংস্থাটির কর্মকর্তারা সেগুলো নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। অথচ পুরো কমিশন থাকলে দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা বলে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে এমন ঘটনায় নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে তদন্ত করা যেত। কমিশনে চারটি বেঞ্চ রয়েছে। অভিযোগ বেঞ্চে ওঠে। কিন্তু কমিশন না থাকলে বেঞ্চে উপস্থাপনার সুযোগ নেই। ফলে ওসব নিয়ে কাজ করারও সুযোগ নেই। কমিশন থাকলে অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করা যেত, নির্দেশনা দেয়া যেত। কিন্তু কমিশন চেয়ারম্যান কিংবা সার্বক্ষণিক সদস্যের নির্দেশনা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই। গত বছর কমিশনে মোট ৭৫১টি অভিযোগ এসেছিল। তার মধ্যে ৩৭৩টি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। আর ২২৮টি অভিযোগের বিচার কাজ চলমান রয়েছে। তাছাড়া অভিযোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ১৫০টির।
সূত্র জানায়, দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে উচ্ছৃঙ্খল জনতা মব সৃষ্টি করে ক্রমাগত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মে মাস পর্যন্ত দেশে অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় দেশে ৭৮ জনের গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে। ১৩টি সীমাšন্ত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে সাতটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া সংখ্যালঘুদের ২৩টি বাড়িঘরে অগ্নিকা-ের ঘটনা, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চারটি হামলার ঘটনা এবং জমি দখলের একটি ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে আর ২ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছে। কারা হেফাজতে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আন্ডার ট্রায়াল আসামি ২২ জন এবং দোষী সাব্যস্ত আসামি ১৫ জন। তাছাড়া জানুয়ারি-মে সময়ে ২৮৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে আর ৯৭টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। আর২৪১টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং ধর্ষণের পর ১৬টি হত্যার ঘটনা রয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যানুযায়ী গত বছরের নভেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫৬ জনের মৃত্যু এবং ২ হাজার ৭৩০ জন আহত হয়। কারা হেফাজতে ৫৭ মৃত্যু আর ৩২৬ জনের অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। সীমান্তে ২১ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। সংখ্যালঘু নির্যাতন, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, হামলা বা জমিজমাসংক্রান্ত ৯৪টি ঘটনা ঘটেছে; ধর্ষণের শিকার ৪৪৩টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১১২টি ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২১টি। এ সময়ে নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছে ৫০৩ জন। একই সময়ে দেশে গণপিটুনিতে ৮১ জনের মৃত্যু এবং ১৮৯ জন হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকহীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা ক্ষুব্ধ।
এদিকে এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপপরিচালক সুস্মিতা পাইক জানান, ভুক্তভোগীর অভিযোগ নিয়েই কমিশনের কাজ। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হয়। প্রয়োজনভেদে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে সুপারিশ করা হয়। তবে গত ৭ নভেম্বর কমিশন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা বিদায় নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না। কারণ কমিশন ব্যতীত এসব ক্ষেত্রে কারোর কোনো ক্ষমতা নেই।
অন্যদিকে এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির জানান, গুরুত্বপূর্ণ একটি কমিশন দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। আট মাস ধরে মানবাধিকার কমিশনে চেয়ারম্যান বা কোনো সদস্য নেই। বর্তমান সময়ে সরকারের কাছে এটি কোনোই গুরুত্ব পাচ্ছে না, যা খুবই দুঃখজনক।
