রাজশাহীর আলোঃ- আবু হেনা মোস্তফা জামান
প্রকৃতি থেকে যায় যায় বলছে ঋতুরানি হেমন্ত। নরম হয়ে এসেছে সূর্যের আলোক রেখা। রোদের উত্তাপ যেন আর গায়ে লাগছে না। দিন যত গড়াচ্ছে তাপমাত্রার পারদ ততই নিচে নামছে।
সুনিপুণ হাতে সেলানো নকশি কাঁথা শরীরে উঠতে শুরু করেছে রাতে। সকালে মিষ্টি রোদ হাসলেই কেবল আড়মোড়া ভাঙছে দীর্ঘ রজনীর। যেন হামাগুড়ি দিয়ে আসছে শীত প্রস্তুতির পালা এখনই।
রোদের উত্তাপ না থাকায় বিকেলেই নামছে সন্ধ্যা। আর সন্ধ্যা হলেই গায়ে উঠছে হালকা গরম কাপড়। বাড়ির আঙ্গিনা বা ছাদে লেপতোশক বানানোর ধুম পড়ে গেছে। শহর কিংবা গ্রাম কোনো ফারাক নেই।
শীতের আগমনী বারতায় প্রকৃতির মতো শীতের প্রস্তুতি চলছে এই তিলোত্তমা নগরেও। শীতকে বরণ করে নেওয়ার জন্য চারিদিকে যেমন ব্যস্ততা বেড়েছে।
এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাজশাহী অঞ্চলে দিনের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকছে। আর দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সাধারণত ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা নেমে আসলেই হালকা শীত অনুভূত হয়, এমনটাই বলছে আবহাওয়া অফিস।
তবে, ঋতু পরিক্রমায় হাড় কাঁপানো শীত নামতে এখনও প্রায় এক মাস বাকি। কিন্তু রাজশাহীতে এখনই শীতের আমেজ মেলায় পরিবারের লোকজনের জন্য বাক্রবন্দি করে রাখা লেপ-কাঁথা ও কম্বলসহ শীতবস্ত্র বের করছেন গৃহবধূরা।
অনেকে পুরনো লেপ ঠিক করার জন্য বের করছেন। আবার অনেকে নতুন করে লেপ তৈরি করতে দিচ্ছেন। আর মানুষের শরীরের কাপড়ে পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন রাজশাহীর ধুনকর পাড়ার কারিগররাও। মহানগরের বিভিন্ন এলাকার অলিগলি ঘুরে ঘুরে ধুনকররা তৈরি করেছেন লেপতোশক।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একটি বাড়িতে লেপ বা তোশক তৈরি করছেন। চলে যাওয়ার সময় আবার অর্ডার নিচ্ছেন পরের দিনের জন্যও। গদির ওপরে ধুনকরের বেতের বাড়ির আওয়াজ আর বাতাসে উড়ে বেড়ানো নরম শুভ্র তুলো জানিয়ে দিচ্ছে যে দুয়ারে শীত এসে গেছে।
রাজশাহী মহানগরীর তুলাপট্টি নামে খ্যাত গণকপাড়ার লেপতোশক তৈরির দোকানগুলোতেও এখন আশপাশের জেলার থেকে আসা কারিগররা কাজ করছেন। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার মত স্থায়ী দোকানগুলোতেও শীতের কাজ চলছে পুরোদমে। এখন তাদের ব্যস্ততার অন্ত নেই।
বর্তমানে পুরনো লেপের তুলো ধুনে এবং কাপড় পাল্টিয়ে নতুনভাবে তৈরির অর্ডারই বেশি পাওয়া যাচ্ছে। সেসঙ্গে গার্মেন্টসের তুলা দিয়ে তৈরি করা লেপতোশকও বিক্রি হচ্ছে।
যার বিক্রি মূল্য সিঙ্গেল ১ হাজার টাকা। আর ডাবল লেপ ১ হাজার ৮শ টাকা। এছাড়া ভালো শিমুল তুলা দিয়ে নতুনভাবে একটি সিঙ্গেল লেপ তৈরি করতে এখন খরচ পড়ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
আর ডাবল লেপ তৈরিতে খরচ হচ্ছে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া সিঙ্গেল তোশক ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ডাবল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে তৈরি করা যাচ্ছে সেখানে।
মহানগরীর গণকপাড়া এলাকার পুরনো ধুনকর মনু মিয়া বলেন, পুরোদমে এখনও শীত শুরু হয়নি। তবে পুরোদমে শীত পড়তে আর বেশী দিন নাই। তাই সবাই আগে থেকেই শীতের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিশেষ করে চলতি সপ্তাহেই সবচেয়ে বেশি অর্ডার পরছে। প্রতিটি দোকানেই ব্যবসা জমে উঠেছে। একেক জন কারিগর সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাতটি পর্যন্ত লেপতোশক তৈরি করছেন।
সাধারণত একটি লেপ তৈরিতে একজন কারিগরের সময় লাগে এক থেকে দুই ঘণ্টা। এভাবে একজন কারিগর দিনে গড়ে পাঁচ থেকে সাতটি লেপ তৈরি করতে পারছেন। দিনে এই সংখ্যার তোশক তৈরি করতেও প্রায় একই সময় লাগছে।
তবে তুলা ও কাপড়ের দাম বাড়ায় গত বছরের তুলনায় এবার লেপতোশকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি লাগছে।
এছাড়া কারিগরদের মজুরিও বেড়েছে। সবমিলিয়ে লেপতোশক তৈরিতে কয়েক দিন থেকে ব্যস্ততা বেড়েছে বলেও জানান মনু মিয়া।
