রাজশাহীর আলোঃ-আবু হেনা মোস্তফা জামান
রাজশাহীতে এক সময়ে সুপেয় পানির সরবরাহের অন্যতম উৎস হিসেবে ব্যবহৃতপ্রাণ বাঁচানো ঢোপকলগুলো আজ শুধুই ‘ঐতিহ্য’ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে নগরীর কয়েকটি পাড়া-মহল্লায়।
পানিবাহিত মহামারি থেকে নগরবাসীর জীবন বাচাতে পুঠিয়ার মহারানী হমন্ত কুমারী নিজ অর্থায়নে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে স্থাপন করেন সুপেয় পানির ‘ঢোপকল’।
এ ঢোপকলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজশাহীর সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। কিন্তু বর্তমানে রাস্তা সম্প্রসারণসহ নানা উন্নয়ন কর্মকান্ডে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে নগরীর ঐতিহ্যবাহী ঢোপকলগুলো।
এবিষয়ে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অবসর প্রাপ্ত প্রফেসর ও হেরিটেজ বাংলাদেশ ইতিহাসের আরকাইভসের পরিচালক ড. মো. মাহবুবর রহমান বলেন, রাজশাহী নগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য একসময় প্রসিদ্ধ ছিলো এই ঢোপকল। সেসময় রাজশাহী শহরে পানযোগ্য পানির খুবই অভাব ছিলো।
এতে কলেরা-আমাশয়সহ পেটের নানান অসুখ ছড়িয়ে পড়েছিল। বেশ কিছু মানুষের মৃত্যুও হয়েছিল। এজন্য ঢোপকলগুলো সবার স্মরণে রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন যা শুধুমাত্র রাজশাহীর ‘ঐতিহ্য’। কিন্তু অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনের মতো ঢোপকলগুলোও বিলুপ্তির পথে। নগর উন্নয়ন ও রাস্তা প্রস্বস্তকরণের কারণে এক এক করে ভেঙে ফেলা হচ্ছে ঢোপকলগুলো। অথচ, এগুলোর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিৎ। ’
রাজশাহীর ইতিহাসের সূত্র টেনে তিনি বলেন, ‘১৯৩৪-৩৯ সাল পর্যন্ত রায় ডিএন দাশগুপ্ত ছিলেন রাজশাহী পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান। সুপেয় পানি অভাবে কলেরাসহ পেটের পিড়া ও মৃত্যুর বিষয়টি চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেন- রাস্তার মোড়ে মোড়ে পানির কল স্থাপন করা হবে। নগরবাসীকে সরবরাহ করা হবে সুপেয় পানি। এতে কমবে পানিবাহিত রোগের প্রাদূর্ভাব।’
‘এলক্ষ্যে ১৯৩৭ সালের আগস্ট মাসের দিকে মিনিস্ট্রি অব ক্যালকাটার অধীনে রাজশাহী ওয়াটার ওয়াকর্স নামে পানি সরবরাহ ও বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।
এই কাজে রাজশাহী এসোশিয়েশনের নামকরা ধনীদের এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধও করা হয়। সেই সূত্র ধরে পুঠিয়ার মহারানি হেমন্ত কুমারী নিজেই দান করেন ৬৫ হাজার টাকা। পরবর্তীতে তিনি সমাজের ধনি ব্যক্তিদের সাহায্যের আহব্বান জানান। এতে সাড়াও মেলে বেশ।
পরবর্তীতে রাজশাহী জেলা বোর্ডের দান করা জমিতে পুঠিয়ার মহারানি হেমন্ত কুমারীর নামে নগরীতে আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে ২০টি ওয়াটার ওয়ার্কস স্থাপিত হয়। কালক্রমে ‘রানি হেমন্তকুমারী ঢোপকল’ নামেই পরিচিত হতে থাকে ঢোপকলগুলো। যা আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজশাহীল পাড়া-মহল্লায়। এরমধ্যে বেশিরভাগই হয়েছে বিলুপ্ত।’
রাজশাহীর বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক ড. তসিকুল ইসলাম রাজা বলেন, ‘২০১০ সালের দিকেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০টি ঢোপকল ছিলো। তবে রাস্তা প্রশস্তকরণ ও বর্তমান পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ না খাওয়ায় রাজশাহী সিটি করপোরেশন এসব ঢোপকলের বেশিরভাগই ভেঙে ফেলেছে, যা রয়েছে সেগুলোও প্রায় বিলুপ্তির পথে।’
‘সর্বশেষ চলতি বছরের ১৩ মে মহানগরীর চণ্ডীপুর এলাকায় একটি ঢোপকল অপসারণ করা হয়। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাস্তা চওড়া করার জন্য এটি অপসারণ করতে হয়েছে। কথা ছিল- ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য ঢোপকলগুলো জাদুঘরে রাখা হবে। কিন্তু বাস্তাবে সেই কাজটি আদৌও বাস্তবায়িত হয়নি বলে জানান তিনি।’
রাজশাহীর বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. গোলাম সারোয়ার বলছেন, ‘রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বহন করছে রানি হেমন্ত কুমারীর ঢোপকলগুলো। অথচ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় তা আজ বিলুপ্তির পথে। এই ঐতিহ্যগুলো রক্ষার জন্য অতিসত্বর রাজশাহীতে একটি নগর জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা উচিত।’
এদিকে রাসিক সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক রাজশাহী বিনির্মাণে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের ১০৮০ কোটি ২২ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩৬ টাকা ১৬ পঁয়সার প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদিত হয়।
যার একটি বড় অংশ ব্যয় হবে নগর অবকাঠামো, রাস্তা পুণঃনির্মাণ ও প্রস্বস্তকরণ, ফোরলেনকরণ, ড্রেন নির্মাণ, ফ্লাইওভার প্রভৃতি প্রকল্পে। ইতিমধ্যে নগরীজুড়ে বিভিন্ন রাস্তা প্রস্বস্তকরণের কাজ শুরু হয়েছে। এতে ভাঙ্গা পড়েছে বেশ কয়েকটি ঢোপকল।
বর্তমানে কতটি ঢোপকল অবশিষ্ট রয়েছে তা জানতে চাওয়া হয় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান মিশুর কাছে। তিনি জানিয়েছেন, ‘এবিষয়ে রাসিকের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে ঐতিহ্যবাহী এসব ঢোপকলের অবস্থান ও তালিকাসহ তথ্য সংগ্রহ করা হবে।’
নগরীর কয়েকটি পাড়া মহল্লায় খোজ নিয়ে পাওয়া গেছে কয়েকটি অবশিষ্ট মহারানী হেমন্ত কুমারীর ঢোপকলের সন্ধান। তার মধ্যে, নগরীর অক্টোরমোড় রাজশাহী হেরিটেজ বাংলাদেশে, বেলদারপাড়া পান্থপথ লাঠিয়াল মন্ডপ মন্দিরের পাশে, কুমারপাড়া বড়মসজিদের পাশে, হেতেম খান মেডিকেল রোডে, হেতেম খান লিচুবাগান বাংলাদেশ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের পাশে, রাজশাহী বেতপট্টি এলাকায় ও নগরীর রানীনগর মোড়ে একটি ঢোপকল রয়েছে।
এছাড়া ফায়ারব্রিগেড মোড়, অনুরাগ কমিউনিটি সেন্টারের মালোপাড়া, রাজশাহী মহিলা কলেজের দক্ষিণ পাশে, ঘোড়ামারা পোস্ট অফিস মোড় ও বেলদারপাড়া সাবিত্রি স্কুল ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি স্থানের থাকা ঢোপকলগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
ঢোপকলগুলোর ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে কথা হয় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. এ বি এম শরিফ উদ্দিনের সাথে। তিনি বলেন, ‘ব্যবহার না থাকায় এই ঢোপকলগুলো সবই অচল।
এছাড়া রাস্তা সম্প্রসারণকালে বেশকিছু ঢোপকল ঠিকাদারেরা না বুঝেই ভেঙ্গে ফেলেছে। তবে অবশিষ্ট ঢোপকলগুলো যা রয়েছে তার সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে প্রদর্শনীর জন্য বরেন্দ্র জাদুঘরে দু’টি ঢোপকল বসানো হয়েছে। নগরীর সিএন্ডবি মোড় থেকে ডিআইজি অফিস পর্যন্ত প্রদর্শনীর জন্য তিনটি এবং কাজলায় হেরিটেজ রাজশাহীর ইতিহাস আর্কাইভে একটি রাখা হয়েছে।
এছাড়া অবশিষ্ট ঢোপকলগুলো যেখানে যে অবস্থায় রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে মেয়র সাহেবের সাথে একটি জরুরী মিটিং কওে তা সংরক্ষণের জন্য একটি কংক্রিট সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কারণ রানী হেমন্ত কুমারী অর্থায়নে তৈরি ঢোপকলগুলো এশহরের ঐতিহ্যের একটি বিশাল অংশ, অবশ্যই এটির সংরক্ষণ ব্যবস্থা করা হবে।
