স্টাফ রিপোর্টার-
কৃষি বিভাগের নির্দেশনায় জমিতে মৌসুম ভিত্তিক দুইটি ফসল সঠিকভাবে চাষাবাদ এবং পরিচর্যা করে আর্থিক সচ্ছলতা পাচ্ছেন দেশের শস্য ভাণ্ডার খ্যাত রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকরা। এতে করে দিন দিন কৃষকদের মধ্যে দুই ফসলি চাষাবাদ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। রাজশাহীর কৃষকদের ফল ও ফসল চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা অনুপাতে খাদ্যপণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
সেই সাথে এক জমিতে কম খরচে ও কম সময়ে অধিক মুনাফা হওয়ায় নতুন সম্ভাবনার দেখা দেওয়ায় ‘সাথী ফসল’ উৎপাদনে ব্যপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে কৃষকদের মাঝে।
তাই প্রান্তিক কৃষকদের হালের কৃষিতে একই জমিতে একই সময় দুই ফসল উৎপাদন করছেন। যে কোনো একটি ফসলের সঙ্গে চাষ করা হচ্ছে সময়োপযোগী আরেকটি ফসল।
ড্রাগন ফলের প্রচুর চাহিদা বেড়েছে বাজারে। তাই ড্রাগন ফল বিক্রি করে আর্থিকভাবে অধিক মুনাফা পাচ্ছেন কৃষকেরা। অন্যদিকে শীতকালীন আগাম সবজি হিসেবে বাজারে বিক্রি করতে “সাথী ফসল” হিসেবে বাঁধাকপিও চাষ করছেন অনেক কৃষক। এতে এক সঙ্গে ফল ও ফসলে বাড়তি অর্থ উপার্জন হচ্ছে চাষিদের। ফলে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যুক্ত হচ্ছে স্থানীয় এ কৃষিপণ্য।
সাথী ফসল পদ্ধতিতে সবাই বিভিন্ন ফল ও ফসল চাষ করলে তা দেশের কৃষিখাতে বিপ্লব ঘটাবে এবং আধুনিক কৃষি সফলতার নতুন মাইল ফলক স্থাপন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে একই জমিতে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অধিক ফসল উৎপাদনে কৃষকদের নানা পরামর্শ দিতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে কৃষি অধিদপ্তর।
রাজশাহীর পবা উপজেলায় ধান, শাক-সবজি ও ড্রাগনসহ মৌসুমি ফল চাষে দেখা দিয়েছে অপার সম্ভাবনা। রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলা কৃষকরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিভিন্ন সবজি চাষাবাদ করে আসছেন। এসব চাষাবাদের মধ্যে ড্রাগন ফল ছাড়াও শীতকালীন টমেটো, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা, লাউ, বেগুন, ঝিঙা, করলা ও বিভিন্ন ধরনের শাক ও ফসল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও কৃষি বিভাগের পরামর্শে ড্রাগনের সঙ্গে একই জমিতে নিয়ম অনুযায়ী বাঁধাকপি, লাউ, ঝিঙ্গা, পটল, বেগুন চাষ করে সফলতা মিলেছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার বারনই নদীর তীরবর্তী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার প্রায় জমিতেই ড্রাগন চাষের পাশাপাশি শাক-সবজি চাষের কৌশল অবলম্বন করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। প্রথমে একজন করছেন। এরপর তার সফলতা দেখে অন্যজন আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এভাবেই বাড়ছে দুই ফসলি আবাদ।
উপজেলার বারনই নদীর তীরের পূর্ব পুঠিয়াপাড়া গ্রামের এমনই এক সফল কৃষকের নাম মোফাক্কার হোসেন। তিনি একজন মাদরাসার শিক্ষক। নিজ গ্রামেই তার তিন বিঘা জমিতে একইসঙ্গে ড্রাগন এবং বাঁধাকপি চাষ করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক এ চাষবাদ পদ্ধতি। সিমেন্টের রিংয়ের ওপর ড্রাগন ফল এবং নিচের মাটিতে চাষ করছেন শীতকালীন সবজি বাঁধাকপি। এটি চাষ পদ্ধতি খুবই ফলপ্রসূ বলে জানান তিনি।
এ পদ্ধতিতে তিনি অল্প সময়ে ছোট্ট ড্রাগন ফল বাগান এবং শীতকালীন সবজির ক্ষেত প্রতিষ্ঠা করেছেন। এরই মধ্য ড্রাগন গাছ ফল দিতে শুরু করেছে।
শিক্ষক মোফাক্কার হোসেনের ড্রাগন বাগান ঘুরে দেখা গেছে নানা গুণ সমৃদ্ধ ড্রাগন ফলের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি অন্য সবজি চাষেও সফলতা পেয়েছেন। এ ক্ষেত সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে প্রায় দুই যুগ টিকবে এবং ফল দেবে। আর এখানে সার প্রয়োগ, সেচ খরচ ও শ্রমিক খরচ বাদে প্রতি মৌসুমে কমপক্ষে ২ লাখ টাকা আয় হবে। এরই মধ্যে তার বাগানের ড্রাগন ফল বাজারজাত করা শুরু করেছেন।
বাজারে এখন মৌসুমে ফল ভরপুর থাকায় প্রতি কেজি ড্রাগন পাইকারি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ড্রাগন চাষে কীটনাশক ব্যবহার করা প্রয়োজন হয় না। ফলকে নিরাপদ রাখার জন্য শুধুমাত্র ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হয়। ১৫ থেকে ২০ দিন পর পর ৮ থেকে ১০ মণ ড্রাগন ফল সংগ্রহ করে রাজশাহীর বাজারেই বিক্রি করেন তিনি।
রোগ-বালাই কম হওয়া, চাষ পদ্ধতি সহজ হওয়া এবং বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় ভিনদেশী এ ফল চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন আশপাশের কৃষকরাও।
সাথী ফসলের সম্ভাবনা ও সফলতা ব্যপারে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) মোজদার হোসেন বলেন, পবার কৃষক মোফাক্কার হোসেন সাথী ফসলে সফল হয়েছেন। তিনি একই জমিতে এক খরচে দুই-তিন জাতের ফসল উৎপাদন করায় এখন ওই এলাকার বেকার যুবকদের মধ্যে ‘সাথী ফসল’ উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ছে। নতুন চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ে স্থানীয়ভাবে তরুণ চাষিদের মনে শক্তি যুগিয়েছেন। তার দেখাদেখি এখন অন্যরাও সাথী ফসল চাষ শুরু করেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ডিডি মোজদার হোসেন আরও বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রযুক্তি ও পরামর্শ দিয়ে পুরো বিষয়টি দেখভাল করছেন। তাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে ফসলের রোগবালাইসহ দমনসহ বিভিন্ন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দিচ্ছেন। তাই ‘সাথী ফসলে’ মানুষের আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলেছে বলেও জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে এ কর্মকর্তা।
