আলো ডেস্ক এক্সক্লুসিভ: রাজধানী ঢাকায় অস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা অত্যন্ত কম বলে দাবি করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে কোথাও ছিনতাই হয়েছে বা হচ্ছে এমন সুনির্দিষ্ট কোনো ডিএমপির কাছে নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি চত্বরে ক্র্যাব-ওয়ালটন ক্রীড়া উৎসব-২০২১ এর উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। ডিএমপি কমিশনার বলেন, সম্প্রতি রাজধানীতে দিনদুপুরে ব্যস্ত সড়কে ছুরিকাঘাতে মোবাইল ফোন ছিনতাইসহ টানা পার্টির দৌরাত্ম্য বেড়েছে। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ছিনতাইকারী শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে মাঠে নেমেছে পুলিশ।
রাজধানীতে হঠাৎ টানা পার্টির দৌরাত্ম্য বাড়া এবং ছিনতাইয়ে অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম জানান, এমন কোনো তথ্য তাদের হাতে নেই। অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার বিষয়ে অপর এক প্রশ্নে তিনি বলেন, যদি অস্ত্র ব্যবহার করে কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে আমরা সে অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই।
আপনারা দেখেছেন, সীমান্ত থেকে নানা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য বেশকিছু অস্ত্র এসেছিল। আমরা গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে সেগুলো উদ্ধার করেছি। ডিবি যেমন উদ্ধার করেছে, তেমনই সিটিটিসিও উদ্ধার করেছে। তিনি বলেন, রাজধানীতে বিপুল সংখ্যক ছিনতাই ও টানা পার্টির সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টানা পার্টির সদস্যরা সবাই মাদকসেবী। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে পুলিশ অভ্যন্তরীণ কৌশল বদলেছে। টানা পার্টিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মাদক মামলাও হবে।
এ সময় মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকতার জায়গাটা জবাবদিহিতার। আমার মতো কমিশনারের দায়িত্বকেও জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, আমি যদি সত্যি মানুষের জন্য, কল্যাণের জন্য কাজ করতে চাই তাহলে আমার আসলে লুকোনোর কিছু নেই, অবকাশেরও কিছু নেই। সাংবাদিক-পুলিশ আমরা সবাই পারস্পরিক সহযোগী হয়ে মানুষের পাশে থাকবো।
অনুষ্ঠানে মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন, মানুষের কল্যাণের জন্য যদি কিছু করতে চাই, তবে যেকোনো অবস্থান থেকেই করা সম্ভব। আমরা যারা সরকারি চাকরি করি, তা জনগণের কল্যাণের জন্যই। চাকরিতে ঢুকলে বেতন এমনি এমনি হয়, কাজ তো কিছু করা লাগবে না- প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে এ মানসিকতা বদলাতে হবে।
সম্মানবোধের সঙ্গে নিজের দায়িত্বটা পালন করতে হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশ প্রধান বলেন, সাংবাদিকরা যদি না থাকতেন তাহলে সরকারি চাকরি যে কি মজার হতো! আমরা চাই না এ চাকরি মজার হোক। আমরা চাই জবাবদিহিতা। গণমাধ্যমে মাঝে-মধ্যে তথ্যের বিভ্রাট ঘটে উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, সম্প্রতি গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বেরিয়েছে যে পুলিশের সদস্যরা বিরক্ত। ১৬/১৭ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয়।
তারা অতিষ্ঠ-বিরক্ত। ডিএমপির একজন কনস্টেবলের বক্তব্য দেওয়া হয়। যেখানে তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন, পুলিশে আসলে উন্নত জীবন পাবেন, সে জীবন পাননি। বাহিনী বেআইনি খাতে টাকা নিচ্ছে, ব্যাংকের জন্য টাকা নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আমি বলছি ডিএমপির কোনো সদস্যের কাছ থেকে একটি পয়সাও কর্তন করা হয়নি। অথচ একজন কনস্টেবলের বরাতে নিউজ করা হলো! ডিএমপি কমিশনার বলেন, ওই নিউজের পর আমি দুই ঘণ্টা ফোর্সের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি।
জানতে চেয়েছি, তোমরা যখন চাকরিতে এসেছো তখন জেলায় কতজন আবেদন করেছিল? কেউ কেউ বলেছে তিন হাজার। সেখানে চাকরি হয়েছে কতজনের? ৩০ জন। তোমাদের কি জোর করে চাকরিতে আনা হয়েছিল? বলে, না স্যার আনা হয়নি। উন্নত জীবন আশা করেছিলে, কিন্তু পাওনি! উন্নত জীবন যেখানে পাও আবেদন করো, সম্মানের সঙ্গে চাকরি থেকে তোমাদের বিদায় করে দেবো।
মোহা. শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, এসএসসি পাস করে পুলিশে এসেছো। পায়ের জুতা থেকে শুরু করে মাথার টুপি পর্যন্ত সরকার বিনা পয়সায় দিচ্ছে। বিনা পয়সায় খাচ্ছো, ব্যারাকে বিনা পয়সায় থাকছো, আবার সরকার তোমাকে বাসা ভাড়াও দিচ্ছে। তুমি যেখানে যাচ্ছ সেখানে গাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছে, খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। হ্যাঁ, মানসিক চাপ আছে।
কাজ করতে গেলে এ চাপ-পরিশ্রম পুলিশে থাকে। তিনি বলেন, সবকিছু মিলিয়ে আমাদের পুলিশে এসেই কনস্টেবল বেতন পাচ্ছে ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু এ ধরনের নিউজ তথ্যের বিভ্রাট ঘটায়। যা যুক্তিসঙ্গত কাজ না। এ ধরনের নিউজের ক্ষেত্রে ডিএমপির রেফারেন্স দিতে হলে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেই করা উচিত। ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, ১৭/১৮ ঘণ্টা ডিউটি করেন একজন কনস্টেবল।
আপনাদের (সাংবাদিকদের) কী ধারণা? ডিএমপি কমিশনার দুই ঘণ্টা ডিউটি করেন? আমাদের তো ঘুমের সময় নাই, খাওয়ার সময় নাই। আমরা যখন চাকরিতে এসেছি, তখন জেনে-শুনে-বুঝেই এসেছি। ২৪ ঘণ্টা ডিউটির বাহিনীতে আমি ১৭ ঘণ্টা ডিউটি করছি। ২৪ ঘণ্টাই যে ডিউটি করানো হচ্ছে না, এটার জন্য পুলিশ সদস্যদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। পুলিশে চাকরি করে ৯টা-৫টা অফিস সম্ভব না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন, প্লানিং অ্যান্ড মিডিয়া) হায়দার আলী খান বলেন, আমাদের সঙ্গে একীভূতভাবে জড়িত সাংবাদিকরা। আমাদের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান হয়। এর মাধ্যমে আমরা সত্যকে উপস্থাপন করি। তিনি বলেন, পুলিশ সদস্য হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আধুনিক পুলিশ গড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। উন্নত দেশের উন্নত পুলিশ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন আইজিপি বেনজীর আহমেদ।
আমরা পুলিশ-সাংবাদিক সবাই দেশকে ভালোবাসি, দেশের উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে কাজ করবো। বাংলাদেশ যেন উন্নত দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে সেজন্য কাজ করি। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ বলেন, মহৎ পেশা সাংবাদিকতায় আপনারা নিয়োজিত। প্রত্যেক সাংবাদিকই মানবাধিকার কর্মী।
তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবেই বিপর্যস্ত অবস্থা। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ন্যায় ফ্রন্টলাইনার হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন সাংবাদিকরা। আমাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্ক গভীর। পুলিশের মিডিয়া উইং এখন অনেক শক্তিশালী। আমাদের নিজেদের মধ্যে দূরত্ব থাকা উচিত না।
সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। এটা যেমন আশার দিক তেমনি গভীর উদ্বেগের বিষয় আছে গুজবের কারণে। সেদিক বিবেচনায় সাংবাদিকদের আরও বেশি যত্নশীল ও সচেতনভাবে সংবাদ পরিবেশনে অনুরোধ জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্র্যাবের সভাপতি মিজান মালিক। সংগঠনটির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক সাইফ বাবলুর সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন- ওয়ালটন গ্রুপের সিনিয়র নির্বাহী পরিচালক এফ এম ইকবাল বিন আনোয়ার ডন, ক্র্যাবের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আরিফ।
