সম্পাদকীয়ঃ বিশ্বজুড়ে চলছে খাদ্য সংকট। গত এক দশকে বিশ্বে খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে- শীর্ষক সংবাদটি রীতিমতো উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও-এর খাদ্যমূল্য সূচকে উঠে এসেছে এ তথ্য।
সংস্থাটির হিসাবে গত বছর খাদ্যশস্য বৃদ্ধির হার ছিল ৩০ শতাংশের বেশি, আর তেলবীজে ১০ শতাংশ, যা ২০১০ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংস্থাটি মূলত খাদ্যশস্য, তেলবীজ, দুগ্ধজাত পণ্য, চিনি ও মাংস- এ পাঁচটি খাদ্যপণ্যের দামের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করে থাকে এই সূচক। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভোজ্যতেল, গম ও চিনির দাম। তারা এর কারণও বলেছে।
কিছু দেশে ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি, উৎপাদন ঘাটতি, করোনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পণ্য চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বিধি নিষেধসহ সীমিত হওয়ার জন্য প্রায় সব খাদ্যের এহেন উল্লম্ফন বলেছে। এও বলেছে যে, ব্যাপক চাহিদা ও স্বল্প উৎপাদনের কারণে আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে দেখা দিতে পারে মূল্যস্ফীতি।
ইতোপূর্বে করোনাভাইরাসজনিত মহামারীর কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দায় বিশ্ব ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
সংস্থাটির বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর (ডব্লিউএফপি) বলেছে, অন্তত ৩৬টি দেশ, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকা দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা, যদি না সময়োচিত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তীব্র খাদ্য সঙ্কটে থাকা মানুষের সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্বে সাড়ে ১৩ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সঙ্কটে রয়েছে।
করোনার কারণে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে সাড়ে ২৬ কোটিতে। খাদ্য সঙ্কটের পেছনে করোনার বাইরেও রয়েছে সিরিয়া-লিবিয়া-সুদান-ইয়েমেনের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো। তদুপরি পর্যটন খাত থেকে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, রেমিটেন্সে ধস, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সাধারণ মানুষের আয়-রোজগার বন্ধসহ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণেও বহু দেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকা পড়েছে হুমকির মুখে।
এই সমূহ ঝুঁকি মোকাবেলায় জরুরী পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছে ডব্লিউএফপি এবং তা অত্যন্ত জরুরীভিত্তিতে। সংস্থাটি বলেছে, চলতি বছর বৈশ্বিক সাহায্য কর্মসূচীগুলো অব্যাহত রাখতে প্রয়োজন কমপক্ষে ১০-১২ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
তবে সুখের সংবাদ হলো, বাংলাদেশ এদিক থেকে রয়েছে সন্তোষজনক অবস্থানে। দেশ বর্তমানে খাদ্য বিশেষ করে ধান-চাল উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। খাদ্য মজুদও সন্তোষজনক। তদুপরি আমন ধান কাটা চলছে। খাদ্য মজুদের লক্ষ্যে সরকার এবার প্রায় ২১ লাখ টন খাদ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল কিনে। গত বছর কেনা হয়েছিল ১৬ লাখ টন। ফলে খাদ্য সঙ্কটের সম্ভাবনা নেই দেশে।
করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী সর্বাগ্রে জোর দিয়েছেন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রি ছাড়াও সরকার ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। এই চাল বিতরণের জন্য বর্তমানের ৫০ লাখ ওএমএসের কার্ডের অতিরিক্ত আরও ৫০ লাখ কার্ড দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি কার্ড থেকে সুবিধা পাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ। এই উদ্যোগগুলো সরকার যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে এটাই প্রত্যাশা।
