উন্নয়ন প্রকল্প হতে হবে নিখুত ও পরিকল্পিত

যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এজন্য সারাবিশ্বে যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ একটি স্বাভাবিক ব্যাপার ও বাস্তবতা। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পাতাল সড়ক, রিং রোডসহ যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করার নানা প্রকল্প নেয়া হয়। আমাদের দেশেও বিগত এক দশক ধরে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নানা উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়েসহ অন্যান্য প্রকল্পের কাজ চলছে। তবে বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বেশিরভাগ দখল করে এসব উন্নয়নমূলক কাজ চলমান থাকায় মানুষের যতায়াতের ক্ষেত্রটি অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে গেছে। কর্মজীবী মানুষসহ সাধারণ মানুষ অশেষ ভোগান্তিতে রয়েছে। উন্নয়ন কাজও শেষ হচ্ছে না, তাদের ভোগান্তিও কমছে না। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল এবং উত্তরা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলছে। প্রধান সড়ক দখল করে এই দুই প্রকল্পের কাজ গত প্রায় এক দশক ধরে চলছে। এতে পুরো রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে রয়েছে। অসহনীয় যানজটের কারণে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। কবে এ থেকে তারা মুক্তি পাবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই।
আমাদের দেশে যেকোনো বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হলে আর শেষ হতে চায় না। শুরুতে এর মেয়াদকাল ও বাজেট একরকম করা হলেও, শেষ পর্যন্ত তাতে আর কুলায় না। যতই দিন যেতে থাকে, ততই এর সময় ও ব্যয় বাড়তে থাকে। কোনো প্রকল্প সময়মতো শেষ হওয়া একটি বিরল ঘটনা। রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করার ক্ষেত্রে যেসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে, সেগুলো বিগত বছরের পর বছর ধরে কি অসীম ভোগান্তি সৃষ্টি করে চলেছে, তা নগরবাসী জানে। সরকারের লোকদের মনোভাব এমন, উন্নয়ন পেতে হলে ভোগান্তি সইতে হবে। জনগণ উন্নয়ন চায়। তবে এই উন্নয়ন করতে গিয়ে কত সময় পর্যন্ত তাদের ভোগান্তি পোহাতে হবে তার হিসাবটি তো তাদের দিতে হবে। অনির্দিষ্ট কাল ধরে যদি উন্নয়ন কাজ চলতে থাকে, তাহলে এই উন্নয়নের কি কোনো অর্থ আছে?
চলমান মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা বিআরটিএ’র কারণে রাজধানীবাসীর ভোগান্তিতে পড়েছে। এসব উন্নয়নমূলক প্রকল্প শুধু মানুষের চলাফেরাকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে না, এ থেকে উৎপাদিত ধুলা-বালি ও কাদা পুরো পরিবেশকে দূষিত করে ফেলছে। ইতোমধ্যে বায়ু দূষণের ক্ষেত্রে ঢাকা শীর্ষ স্থান দখল করেছে। কয়েক বছর আগে প্রকাশিত পরিবেশ অধিদফতরের এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজম্যান্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু রাজধানীতে বায়ু দূষণজনিত রোগে বছরে মারা যায় ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ।
উন্নয়ন নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। তবে উন্নয়ন প্রকল্প হতে হবে নিখুত, পরিকল্পিত ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এবং তা শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। উন্নত বিশ্বে একটি প্রকল্পের কাজ শেষ করার মেয়াদ পাঁচ বছর ধরলে তা তারা মেয়াদের আগেই শেষ করে। আমাদের দেশে হয় উল্টো। এতে উন্নয়নের গতি যেমন মন্থর হয়ে পড়ে, তেমনি জনগণের অর্থেরও অপচয় হয়। আমরা আশা করব, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এ বিষয়টির দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেবেন। প্রকল্পের কাজ কেন সময়মতো শেষ হয় না এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা করতে হবে। এর সাথে যারা জড়িত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প শুরুর আগেই মানুষের যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবেশের যাতে ক্ষতি না হয় এ দিকটি নিশ্চিত করতে হবে।