দাম বাড়ছে নিত্যপণ্যের সাধারণ মানুষের কথা ভাবতে হবে

আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ক্রমেই কমছে। গত এক বছরে কমেছে ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের বাজারে এক বছরে চালভেদে দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। চাল উৎপাদনে ঘাটতি নেই। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে এক বছরে চালের চাহিদা রয়েছে দুই কোটি ৫৮ লাখ টন। গত অর্থবছরে উৎপাদিত হয়েছে তিন কোটি ৮৭ লাখ টন। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হয়েছে এক কোটি ২১ লাখ টন। চালের আমদানিও থেমে নেই। গত জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত তিন মাসে আমদানি হয়েছে পাঁচ লাখ ৫১ হাজার টন। এখন ঋণপত্র খোলা হয়েছে প্রায় আট লাখ টনের। অর্থাৎ আরো প্রায় আড়াই লাখ টন চাল আসছে। বর্তমানে সরকারের গুদামে রয়েছে ১৪ লাখ ৪৫ হাজার টন। তার পরও চালের দাম সেই অনুপাতে কমছে না কেন? একই অবস্থা পেঁয়াজের। অতিরিক্ত উৎপাদন এবং আমদানি সত্ত্বেও দাম হু হু করে বেড়ে চলেছে। আর দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব প্রক্রিয়া।
আমাদের বাজার কোনো নিয়ম-নীতি মেনে চলে না, যে কারণে উৎপাদন বা জোগান অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও এখানে ক্রমাগতভাবে দাম বেড়ে যায়। বলা হয়, এখানে ব্যবসায়ীদের নানা রকম সিন্ডিকেট রয়েছে। সুযোগ পেলেই এসব সিন্ডিকেট বাজার অস্থির করে তোলে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং ক্রেতাদের পকেট কাটে। দেশে এখন প্রচুর চালকল আছে। চালের অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী আছেন। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীও তৈরি হয়েছেন। তাঁদের লাখ লাখ টন চালের মজুদ গড়ে তোলার মতো সক্ষমতা আছে। অভিযোগ আছে, অনেক ব্যাংক এ কাজে তাঁদের অর্থায়নও করে। উল্টো দিকে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক দাম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত সক্ষমতার অভাব রয়েছে। ফলে শুধু এ বছর নয়, প্রতিবছরই বাজারে সিন্ডিকেটের হামলা হতেই থাকে। আর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রতিবছর একই অজুহাত দিতে থাকেন। একই ধরনের মিথ্যা আশ্বাস দেন। আর প্রতিকারহীন বাজার নিয়ে ভোক্তাদের হতাশা বাড়তেই থাকে।
ভোক্তা প্রতিনিধি ও বাজার বিশেষজ্ঞরা এসব ব্যাপারে সরকারকে এ পর্যন্ত অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সবই যেন অরণ্যে রোদনের শামিল হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু টিসিবির নামমাত্র ট্রাক সেল বা ওপেন মার্কেট সেল এতটাই অপ্রতুল যে তা বাজারে কোনো প্রভাবই ফেলে না। বিশেষজ্ঞরা সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ বাড়িয়ে ৫০ লাখ টন কিংবা আরো বেশি করার পরামর্শ দিয়েছেন; কিন্তু তা হয়নি। এটি করা গেলে উৎপাদন মৌসুমে কৃষক যেমন ন্যায্য মূল্য পেত, তেমনি সংকটের সময় মজুদ ছেড়ে দিয়ে বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ করা যেত। মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন আয়ের মানুষ। তাই জনসংখ্যার অন্তত ৩০ শতাংশের জন্য আবার রেশন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। আমরা চাই, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা হোক।