রাজশাহী অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে আমন ধান উৎপাদন

আবু হেনা মোস্তফা জামান
রাজশাহী অঞ্চলে শুরু হয়েছে আমন ধান কাটা ও মাড়াই। এরই মধ্যে কাটা হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ ধান। কাটার উপযুক্ত হতে বাকি এখনও ৮৮ শতাংশ ধান মাঠে। তবে এই মাসেই শতভাগ ধান উঠবে কৃষকের ঘরে। এবারে ফলন ও দাম দুটোই ভালো থাকায় শঙ্কা কিছুটা কম।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এবার রোপা আমনের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩৬ হাজার হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে চার লাখ দুই হাজার হেক্টর।

যেখানে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৬৮ মেট্রিকটন চাল। এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে শুধু আবাদই হয়নি, যে ১২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে সেখানে উৎপাদন হয়েছে প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ১৯ মেট্রিকটন চাল। বাকি ৮৮ শতাংশের প্রতি হেক্টরে উৎপাদন ৩ দশমিক ১৯ বা এর আশেপাশেই থাকবে বলে আশাবাদী আঞ্চলিক কৃষি বিভাগ।

কৃষকদের ভাষ্য, এবার রোপা আমন চাষে তেমন বেগ পেতে হয়নি। পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম ছিল। ফসল নষ্টকারী ইঁদুরের আক্রমণ ছিল শঙ্কার চেয়ে অনেক কম। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত অনুকূল আবহাওয়া পাওয়া গেছে। যার কারণে ফলনও ভালো হয়েছে। তবে ফলন বেশি হলে দাম কমে যায়।

এটা কৃষকদের জন্য দুর্ভোগের। বিশেষ করে যেসব চাষির ধান মজুতকরে রাখার সক্ষমতা নেই। তাদের ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে তুলতে হয়। এই সময়টাই কৃষক তার ধানের ন্যায্য দাম পান না। তবে এবার চালের দাম বেশি। একারণে বাজারে এখন পর্যন্ত ধানের দামও ভালো আছে। আর যেহেতু ফলন ও দাম দুইটাই ভালো কাজেই এবার খুশিটাও বেশি।

গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, তার ক্ষেতজুড়ে ফসল দেখলে মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে ধান কাটা পড়বে। তিনি প্রায় ৪ বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত ধানের তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। প্রতি বিঘায় ২২ মণের বেশি ফলন হবে বলে আশা তার।

পবা উপজেলার কৃষক জামাল জানান, এবার ধানের ফলন অনেক ভালো। মধ্যের বৃষ্টিটা ধানের জন্য অনেক উপকারী ছিল। কয়েকটি সেচ কম লেগেছে। তার সঙ্গে পোকার উপদ্রবও তেমন নেই। তার সাড়ে চার বিঘা জমিতে সুমন স্বর্ণা ধানের আবাদ করেছেন। প্রতিবিঘায় অন্যান্য বছরের তুলনায় এক থেকে দেড় মণ ধান বেশি হবে বলে আশাবাদী তিনি।

পবা উপজেলা কৃষি অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে আউশ, আমন এবং বোরো- এই তিন মৌসুমে ধান চাষ করা হয়। এ বছর উপজেলার আটটি ইউনিয়নে নয় হাজার ৩১৫ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় ভালো ফলন হয়েছে। তাই ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

পবা উপজেলার সবসার গ্রামের কৃষক সেলিম জানান, এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তিনি এ বছর ৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে দুই বিঘা জমিতে ৪৪ মণ ধান পেয়েছেন এবং বাকি ৩ বিঘা জমিতে ধান কাটা চলছে। বিঘাপ্রতি প্রায় ১৮ থেকে ২২ মণ ধানের ফলন হয়েছে। তিনি স্বর্ণা ও ব্রি ধান-৪৯ চাষ করেছেন।

ভালাম গ্রামের কৃষকরা বলেন, গত বছর মাজরা পোকা ও কারেন্ট পোকার উপদ্রব বেশি ছিল, তাই ধানের ফলন কম হয়। বিঘাতে ৮ থেকে ১০ মণ ধান পেয়েছিলাম। কিন্তু এ বছর সঠিক বালাইনাশক ব্যবহার করে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে ব্রি ধান-৭১ চাষ করে ৬৬ মণ ধান পেয়েছি।

বাঘা উপজেলা কৃষি অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বাঘা উপজেলায় এবার এক হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষাবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার ৩৬০ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৮০ হেক্টর জমিতে বেশি চাষাবাদ হয়েছে। ধান প্রতি হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪.১৪ মেট্রিকটন। এতে করে মোট ধান উৎপাদন হবে ৫ হাজার ৬৩০ মেট্রিকটন।

বাঘা উপজেলা কৃষি অফিসার শফিউল্লাহ সুলতান বলেন, চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এবার রোপা আমন চাষ বেশি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলে রোপা আমন ভালো হয়েছে। পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য উপ-সহকারী কৃষি অফিসাররা মাঠে মাঠে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছেন। যাতে ফলন ভালো হয়।

আশা করি, কৃষকরা ভালো ফলনের পাশাপাশি ভালো দামও পেয়ে যাবেন। রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রোপা আমনের আবাদ ও উৎপাদন হয়েছে।

এবার রোপা মৌসুমে ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান -৫১ সহ আরও কয়েকটি ধানের আবাদ হয়েছে। তবে ব্রি ধান-৫১ এর আবাদটা কিছুটা বেশি। এখন পর্যন্ত তেমন কোনও দুর্যোগের সম্মুখীনও চাষিদের হতে হয়নি। সবমিলিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে আমনের আবাদ ভালো।