গোদাগাড়ীতে প্রভাবশালী বর্গাচাষীর দখলে নারী ওয়ারিশের জমি, নিরাপত্তাহীনতায় মালিকপক্ষ
স্টাফ রিপোর্টার
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের মালিগাছা গ্রামের এক নারী ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া ও ক্রয়কৃত জমির মালিক সোহানা সাফর, জমি দখল নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে। এ বিষয়ে গোদাগাড়ী মডেল থানায় সোহানা সাফরের স্বামী মোহাম্মদ আলী বাদি হয়ে গত ১২ এপ্রিল একটি সাধারণ ডায়েরি জিডি নং-৫৯৭ করেছেন। জমির প্রকৃত মালিক সোহানা সাফরের পক্ষে মোহাম্মদ আলী অভিযোগ করেছেন, তার স্ত্রীর নামে থাকা ০.১৭২৫ শতক জমি দীর্ঘদিন ধরে টিপু সুলতান নামে একজন প্রভাবশালী বর্গাচাষী জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে। একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মালিগাছা গ্রামের মোহাম্মদ আলীর স্ত্রীর ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া ও পরবর্তীতে ক্রয় করা জমিটি মুঞ্জুখর মৌজার গুনিগ্রাম মাঠে অবস্থিত। জমির হাল দাগ নং-১১৭, হোল্ডিং নং-১৫৬, প্রস্তাবিত খতিয়ান নং-১৭০, জেএল নং-৩২৯ অনুযায়ী সকল বৈধ কাগজপত্র, দলিল ও খাজনা পরিশোধ রয়েছে তাদের নামে।
মোহাম্মদ আলী বলেন, “ওই জমিটি আমার স্ত্রীর ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি। দীর্ঘদিন ধরে আমরা চাষাবাদ করে আসছি। হঠাৎ করে স্থানীয় একজন প্রভাবশালী বর্গাচাষী মোঃ টিপু সুলতান পিতা মৃত রুস্তম আলী জমিটি জবরদখল করে নেয় এবং এখন নিজের জমি বলে দাবি করছে।”
তাঁর অভিযোগ, একাধিকবার আমিন ডেকে জমি মাপা হলে দেখা যায়, টিপু সুলতান তাঁর চাষাবাদকৃত জমির বাইরে অতিরিক্ত জমি দখল করে আছেন। মাপের সময় তাকে এবং জমির মূল মালিককে একাধিকবার ডাকা হলেও তারা কেউ উপস্থিত হননি। এমনকি, পরবর্তীতে জমির সীমানা চিহ্নিত করে রাখা হলেও রাতারাতি তা উঠিয়ে ফেলা হয়। আমার জমির ওপর ১৫ থেকে ২০ টা আম গাছের চারা লাগানো ছিল।ক্ষমতার দাপটে আম গাছের চারা গুলো তুলে ফেলে দেয় টিপু সুলতানের লোকজন।
মোহাম্মদ আলী আরো বলেন, “আমি ৫নং গোগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে গত ৯ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে তাকে নোটিশ দিয়েছি জমি মাপার জন্য। কিন্তু সে আসে না। আমি স্থানীয় লোকজন ও আশপাশের জমির মালিকদের উপস্থিতিতে আবারো মাপ দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করি, কিন্তু সেই চিহ্নও সে নষ্ট করে। এভাবে সে দুই-তিনবার চিহ্ন উঠিয়ে ফেলে এবং আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়।”
প্রতিবাদ করায় মোহাম্মদ আলী ও তার পরিবার বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি গোদাগাড়ী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করার জন্য আবেদন করেছেন। তার বক্তব্য, প্রশাসন বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে,দখলকারীকে আইনের আওতায় এনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। আমার বৈধ জমি আমি ফেরত চাই।”
গোদাগাড়ী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-এর কাছে পাঠানো আবেদনে মোহাম্মদ আলী অনুরোধ জানিয়েছেন, আইনানুগভাবে দখলদারকে চিহ্নিত করে সীমানা রক্ষা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়ার।
গ্রামবাসীর বক্তব্য: “চোখের সামনে অন্যায় দেখছি, কিন্তু কিছু করতে পারছি না” স্থানীয় এক প্রবীণ গ্রামবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা নিজের চোখে দেখেছি, মোহাম্মদ আলীর জমি টিপু সুলতান জোর করে চাষাবাদ করছে। বারবার মাপার পরেও সে মেনে নিচ্ছে না। আমরা ছোটলোক, কিছু বললে ভয় পাই, যদি আমাদেরও হুমকি দেয়।”
স্থানীয় এক অভিজ্ঞ আইনজীবী বলেন, “এই ঘটনা অবৈধ দখলের একটি ক্লাসিক উদাহরণ। এখানে জমির বৈধ মালিকানা, দলিল ও খাজনা রেকর্ড সব কিছু আছে। বর্গাচাষীর কোনো অধিকার থাকে না মালিকানা দাবি করার। এটি দ্রুত বিচার ও পুলিশের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
৫নং গোগ্রাম ইউনিয়নের একজন ইউপি সদস্য জানান, “আমরা একাধিকবার উভয় পক্ষকে ডেকে জমির মাপ ও সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু দখলকারী পক্ষ কখনো সময়মতো উপস্থিত হয়নি। আমরা বিষয়টি থানা প্রশাসনকে জানাতে বলেছি।”
গ্রামের এমন জমি সংক্রান্ত বিরোধ শুধু একটি নির্দিষ্ট পরিবারকেই নয়, গোটা সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। একদিকে জমির মালিক তার অধিকার থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে বর্গাচাষীর অতি আত্মবিশ্বাস স্থানীয় আইনের প্রতি অনাস্থা তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা।
এ বিষয়ে জানতে গোদাগাড়ী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রুহুল আমিন এর মুঠোফোনে ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
