ইফতেখার আলম বিশাল
রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের আলোচিত অধ্যক্ষ কালাচাঁদ শীলকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি)করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) উপসচিব তানিয়া ফেরদৌস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। একই আদেশে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আউয়ালকে রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
এর আগে অধ্যক্ষ কালাচাঁদ শীলের বিরুদ্ধে হিসাবরক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ-বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেনে অস্বচ্ছতা, ছাত্রসংগঠনের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার-এমন একাধিক অভিযোগে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে ওএসডি করার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রজ্ঞাপন জারির পর কলেজজুড়ে গুঞ্জন-বদলি ঠেকাতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলে তদবির ও যোগাযোগ শুরু করেছেন অধ্যক্ষ কালাচাঁদ শীল। এমনকি সিদ্ধান্ত বদলাতে চাপ সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে।
সম্প্রতি কলেজে যোগদান করা একজন হিসাবরক্ষককে দায়িত্ব না দিয়ে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক (ভারপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার) কাজল এবং দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী মহসিন ও হারুণের মাধ্যমে। অভিযোগ-তাদের যোগসাজশে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি থেকে শুরু করে কলেজের উল্লেখযোগ্য আর্থিক লেনদেনে অনিয়ম ও দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে।
মাস্টাররোলে কর্মরত সুমন আলীর দাবি-অধ্যক্ষ যোগদানের পর কয়েকজন কর্মচারীকে ছাঁটাই করে দলীয় প্রভাব ও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নতুনদের নিয়োগ দেন। আওয়ামী লীগের সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৪ জনের মধ্যে একজন নারী মিতুল দাস, যিনি ‘গানের শিক্ষক’ হিসেবে নিয়োগ পান; অথচ মসজিদের ইমামের বেতন বাড়ানো হয়নি, বরং ওই গায়িকার বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে।
অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠতার কারণে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বায়তুল হোসেন তরু ও মইনুল ইসলাম বাপ্পির বোনদেরও মাস্টাররোলে নিয়োগ দেওয়া হয়। কলেজে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এই দুই নেতাকে তিনি ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, তরু ও বাপ্পি গত ৫ আগস্ট অস্ত্রধারী হামলার ঘটনার পর থেকে পলাতক।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে প্রকাশিত ম্যাগাজিন প্রকল্পে অনুমোদিত ৫ লাখ টাকার জায়গায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। সেই ম্যাগাজিনগুলো এখন গুদামে অযতেœ পড়ে আছে। এছাড়া ‘হাসিনা বন্দনা’র নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
নির্মাণ কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মাউশির নির্দেশিত স্থানে ভবন না করে কলেজ মাঠ নষ্ট করে ১৪০ ফিটের ছয়তলা বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যা নাকি করা হয়েছে সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনের অনুকম্পা পেতে এবং আর্থিক সুবিধার জন্য।
এছাড়া সরকারি হিসাবরক্ষক থাকা সত্তে¡ও শূন্য কাগজে সই করিয়ে আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করেছে হারুন ও মহশীন। এমনকি কলেজের খাতা, প্যাড ও খামের ওপর ‘শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’ রাজনৈতিক ¯েøাগান ব্যবহার করারও অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষকরা দাবি করেন-অধ্যক্ষ সচেতনভাবেই এসব করেছেন এবং প্রভাবশালী মহল ও বিদেশি দূতাবাসের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন।
সব অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে ওএসডি করে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়।
ওএসডি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন- “ওএসডি করা হয়েছে অনেককেই, তার মধ্যে আমি একজন। সরকারি চাকরিতে আছি-সরকারের সিদ্ধান্ত মানতেই হবে। আদেশ হয়েছে, সময়মতো আমি চলে যাবো। ছুটি চলছে, ছুটির পরে নির্ধারিত সময়ে যোগদান করব।”
বদলি ঠেকানোর অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন-“এসব কথা ঠিক নয়। সরকারি চাকরি করি-একদিন না একদিন যেতেই হবে।”
