স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশ রেলওয়ে (পশ্চিম) রাজশাহীর এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তন, চাকরি গ্রহণে অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে প্রায় আট মাস সময় নিয়েও অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ার দাবি করেছে তদন্ত কমিটি। তবে অভিযোগকারী বলছেন, নথিপত্রে থাকা অসঙ্গতিগুলো যাচাই করলেই অভিযোগের ভিত্তি স্পষ্ট হওয়ার কথা ছিল। তদন্তে সেসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
অভিযোগকারী মো. হারুন জানান, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ রেলওয়ে (পশ্চিম)-এর অধীন রাজবাড়ী যান্ত্রিক শাখার ফিটার মুসা ফকিরের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সরকারি চাকরি গ্রহণে অনিয়ম, এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনে জালিয়াতিসহ একাধিক অভিযোগ এনে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজারের (ডিআরএম) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
তার দাবি, অভিযোগের পর মুসা ফকির অস্ত্রের মুখে তাকে তুলে নিয়ে মারধর করেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহারের কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেন।
পরে ২০২৫ সালের আগস্টে হারুনের স্ত্রী ফরিদা পারভীন একই অভিযোগে পশ্চিম রেলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বরাবর পুনরায় আবেদন করেন।
অভিযোগটি আমলে নিয়ে পশ্চিম রেলের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ডিএমই) রবিউল ইসলামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির অন্য সদস্য ছিলেন ডিপিও মো. ফেরদৌস ও ডিএসটিই আহমেদ ইশতিয়াক জহুর।
প্রায় আট মাস তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের এপ্রিলে চার পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হারুনের অভিযোগ, ১৯ এপ্রিল তিনি আবারও মহাব্যবস্থাপকের কাছে লিখিতভাবে জানান যে, তাকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে আগের অভিযোগ প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছিল। মহাব্যবস্থাপক তাকে প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (সিএমই) আমিনুল ইসলামের কাছে আবেদন দিতে বলেন এবং একটি অনুলিপি নিজের কাছেও রাখতে বলেন।
কিন্তু অভিযোগকারীর দাবি, তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ওই আবেদন সিএমই দপ্তরেই পড়ে আছে; এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
গত ২০ মে প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, এ ধরনের কোনো আবেদন তার কাছে আসেনি। পরে দপ্তরের এক প্রকৌশলী একটি আবেদনপত্রের কথা জানালে তিনি বলেন, “এটার তো তদন্ত প্রতিবেদন হয়ে গেছে, আবার নতুন দরখাস্ত কেন?”
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তবে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলে প্রতিবেদন সরবরাহ করা সম্ভব বলে জানান।
হারুনের দাবি, মুসা ফকিরের ২০০৮ সালে করা জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ২২ ডিসেম্বর ১৯৭২। কিন্তু ২০২৩ সালের ৫ জুলাই নতুন জন্মনিবন্ধন ও এনআইডিতে জন্মতারিখ করা হয়েছে ৫ জুলাই ১৯৮২।
তার অভিযোগ, এই পরিবর্তনের ফলে পারিবারিক নথিতেও অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন এনআইডি অনুযায়ী মুসা ফকিরের জন্ম ১৯৮২ সালে হলেও তার বড় মেয়ে মৌসুমীর জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ২৬ জানুয়ারি ১৯৯২। এছাড়া পারিবারিক ওয়ারিশ সনদ অনুযায়ী কয়েকজন ছোট ভাই-বোনের বয়সও তার চেয়ে বেশি দেখাচ্ছে। ছোট বোনের জন্মতারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৮৩, অর্থাৎ মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে দুই সন্তানের জন্ম দেখানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, এসব নথি একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়ে যায়। তবু তদন্ত কমিটি বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করেনি।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “একটি এনআইডি-সংক্রান্ত অভিযোগ দুই বছরেও কেন প্রমাণ করা গেল না? তদন্তে কোনো প্রভাব বা অন্য কোনো কারণ কাজ করেছে কি না, সেটিই জানতে চাই।”
অভিযোগ অস্বীকার করে মুসা ফকির বলেন, “আমি অনেক বড় হয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুলের সনদ অনুযায়ীই এনআইডি করা হয়েছে।”
এ সময় পাশে থাকা তার স্ত্রী বলেন, সরকারি চাকরির জন্য তখন বয়স কমানোর সুযোগ ছিল বলেই সেটি করা হয়েছিল।
মুসা ফকিরের মেয়ে মৌসুমী বলেন, “স্কুলে বাবার নাম ছিল মতিয়ার রহমান। সে কারণেই আমার এনআইডিতে বাবার নাম মতিয়ার রহমান রয়েছে। চাকরির নিয়মের কারণে বাবার বয়স কমানো হয়েছিল।”
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, “আমরা সরকারি বিধি অনুযায়ী তদন্ত করেছি। সংশ্লিষ্ট স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, স্কুলের সনদ সঠিক। পরে সরকারি ফি জমা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে এনআইডিও যাচাই করা হয়েছে। সেখানেও তথ্য সঠিক পাওয়া গেছে।”
অভিযোগকারীর দেওয়া পুরোনো জন্মনিবন্ধন ও মেয়ের এনআইডি তদন্তে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যতটুকু করা সম্ভব, আমরা সেটুকুই করেছি।”
প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পশ্চিম) আমিনুল ইসলামের দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি কল কেটে দেন। পরবর্তীতে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে যার সুপারিশে চাকরি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেই অবসরপ্রাপ্ত সচিব শাহ মো. এমদাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
