আলো জা তী য় ডেস্ক: লকার ভাঙা শেষে ইভ্যালির অর্থ পাচার হয়েছে মর্মে সন্দেহ পোষণ করেছেন বোর্ড চেয়ারম্যান ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। গতকাল সোমবার বিকেল ৫টার দিকে ধানমন্ডি ইভ্যালির কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ সন্দেহ পোষণের কথা জানান।
তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর তথ্য ও কাগজপত্রে এ ব্যাংকগুলোতে যতো অর্থ থাকার কথা জেনেছি, তা যথেষ্ট সন্দেহ করার মতো। ইভ্যালির টাকা পাচার হয়েছে বা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছি। অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা ক্লু পেয়ে এই সন্দেহ কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মোটামুটি আন্দাজ পেয়েছি।
কারণ তথ্য উপাত্ত ও কাগজপত্রে তাই মনে হচ্ছে। অর্থ পাচার হয়েছে কিনা সেটা আমরা জানার চেষ্টা করছি। অডিট করলে সেটি স্পষ্ট হবে। এর সঙ্গে র্যাব ও সিআইডি জড়িত। তারাও কাজ করছে। শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, আমরা এই অফিসের ভবন মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তিনি বলেছেন, ইভ্যালির রাসেল দম্পতি প্রায়ই দেশের বাইরে যেতেন, দুবাই যেতেন।
সেটাও একটি কারণ। মানিক বলেন, সিন্দুকের পাসওয়ার্ড রাসেল জানতেন না, তিনি বলেছিলেন, ডায়েরিতে লেখা ছিল। যেটি ভবন মালিক চুরি করে নিয়ে গেছে। লকার ভেঙেও টাকা মিললো না। অথচ বলছেন, এখানে টাকা থাকার কথা ছিল এবং ইনভেলাপ ছিঁড়ে টাকা বের করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ভবন মালিককে আপনারা সন্দেহ করছেন কিনা বা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন কিনা? জানতে চাইলে মানিক বলেন, আমরা নিচের লকারে বেশ কিছু ইনভেলাপ ছেঁড়া পেয়েছি। সেখানে টাকা ছিল, সেই টাকা এখন নাই।
মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির অভিযোগ করেছে রাসেল। সরঞ্জাম চুরির অভিযোগে চুরির মামলা দিয়েছি। একদিন রিমান্ডেও ছিল ভবন মালিক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, বোর্ডের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি রেজাউল আহসান, আইনজীবী ব্যারিস্টার খান মো. শামীম আজিজ, অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলন, এফসিএ অ্যান্ড এফসিএমএ এর সাবেক চিপ চার্টার্ট অ্যাকাউন্টেন্ট ফখরুদ্দিন আহমেদ, ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসফিয়া সিরাত।
এর আগে, ইভ্যালির ধানমন্ডি অফিসের দুটি লকারের পাসওয়ার্ড না পেয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ভাঙা হয়েছে। সেই দুটি লকার ভাঙার পর দেখা যায়- দুই লকার মিলিয়ে দেড় শতাধিক বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই। প্রথম লকারে মেলেনি টাকা, দ্বিতীয় লকারে মিলেছিল মাত্র ২৫৩০ টাকা। চেকগুলোতে সই রয়েছে ইভ্যালির শীর্ষ কর্মকর্তাদের। গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় ধানমন্ডির ইভ্যালি অফিসের নিচতলায় দ্বিতীয় লকারটি কাটা হয়।
এতে ট্রেড গাইডলাইন বুক, ইভ্যালির খামে রাখা খালি ভাউচারসহ অপ্রয়োজনীয় নানা কাগজও পাওয়া যায়। ইভ্যালির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি সংগ্রহ করতে গত বছরের ২৩ নভেম্বর কারাগারে থাকা প্রতিষ্ঠানের সিইও মো. রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনকে তাদের ধানমন্ডির অফিসের লকারগুলোর ‘কম্বিনেশন নম্বর’ দেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তবে তারা পাসওয়ার্ড বা কম্বিনেশন নম্বর না দেওয়ায় গতকাল সোমবার বিকেলে প্রথমে ভাঙা হয় একটি লকার।
দুপুর আড়াইটার দিকে ধানমন্ডিতে ইভ্যালির কার্যালয়ে আসেন আদালত কর্তৃক মনোনীত পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকসহ অন্যরা। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ইলেকট্রিক কাটার দিয়ে লকার কাটার কাজ শুরু হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসফিয়া সিরাত। এ ছাড়া ধানমন্ডি থানার একটি দলও উপস্থিত ছিল। বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে একটি লকার কাটা শেষ হয়।
তাতে সিটি ও মিডল্যান্ড ব্যাংকের শতাধিক চেকবই পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন ফাইলে কিছু নথিপত্রও দেখা গেছে। সে সময় বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, আমাদের আরেকটি লকার আছে নিচতলায়। সেটাও ভাঙা হবে। আপনারা তো দেখলেন কী পাওয়া গেল, শুধু চেকবই। আমরা তো হতাশ। আমরা আশা করেছিলাম টাকা-পয়সা থাকবে, দরকারি কাগজপত্র থাকবে, যা পেলাম এগুলো কোনো কাজেই আসবে না। তিনি আরও বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে হয়তো অডিটর নিয়োগ দেবো।
সেজন্য কাগজপত্র রেডি করা হচ্ছে। অডিটররা আমাদের তিনটা গোডাউন আছে সাভারে সেখানে যাবে, দেখবে কী কী আছে। ইভ্যালির গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কোনো কোম্পানি দেউলিয়া হলে সেখানে আনুপাতিক হারে পরিশোধ করতে হয়। এখানে মার্চেন্ট, গ্রাহক দুই ধরনের পাওনাদার আছেন। আমাদের সিদ্ধান্ত হলো আমরা কাস্টমারদের পাওনা আগে দেবো। এদিকে ইভ্যালির সার্ভার দেখভালের দায়িত্বে ছিল বিদেশি প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন। বর্তমানে সার্ভার বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি টাকা।
এই ৬ কোটি টাকা দেওয়া না হলে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান ইভ্যালি বিষয়ে হাইকোর্ট নির্দেশিত বোর্ডের চেয়ারম্যান সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। তিনি বলেন, সার্ভার চালু করতে চাইলে অ্যামাজন আমাদের কাছে ৬ কোটি টাকা দাবি করেছে। তবে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিতে আমরা অ্যামাজনের সঙ্গে দরকষাকষি করছি। গত তিন মাস ধরে আমরা চেষ্টা চালিয়ে আসছি। এ ছাড়া বিকল্প উপায়েও আমরা চেষ্টা চালিয়ে আসছি সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য।
যে পরিমাণ টাকা দেওয়া হোক না কেন, পুরো টাকাটা ইভ্যালির অ্যাকাউন্ট থেকেই দেওয়া হবে। সার্ভার নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারলে গ্রাহকের কিংবা মালামালের কোনও তথ্যই আমরা পাবো না। তিনি আরও বলেন, সার্ভার থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে আমরা বুঝতে পারবো ইভ্যালির কাছে গ্রাহকদের পাওনার বিষয়ে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিষয়গুলো অডিটের মাধ্যমে জানতে পারবো। প্রতিষ্ঠানটির কাগজপত্র বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। অডিটর নিয়োগ হলে সেসব কাগজপত্র একত্র করে প্রতিষ্ঠানটির সম্পত্তির বিষয়ে জানা সম্ভব হবে।
প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রাসেল ও তার স্ত্রী ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে।
গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে রাসেল ও শামীমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তারা কারাগারে। গত ১৮ অক্টোবর আদালত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি দেখভাল করতে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে চেয়ারম্যান করে পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করেন।
