রা জ শা হী র আ লোঃ – স্টাফ রিপোটার
রাজশাহীতে শিশুবিবাহ প্রতিরোধে জেলা পর্যায়ে পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অঙ্গীকার করেছেন- ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নির্মূল করতে হবে। সেই লক্ষ্যে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুসারে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তি সমন্বয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর সুফল ইতিমধ্যে জনগণ পেতে শুরু করেছেন। বাল্যবিবাহ বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টির ফলে মোহনপুর ঘাসিগ্রাম ইউপির রাজিয়া সহ অসংখ্য অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল আরও বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম সামাজিক সমস্যা বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শুধু অপ্রাপ্তবয়স্ক বর, কনে বা তাদের পরিবার না, যাঁরা বিয়ে পরিচালনা করেন এবং বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন, তাঁদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে ৷
ইউনিসেফের সহযোগিতায় ও এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি) এর আয়োজিত সভায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কল্যাণ চৌধুরীর সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ প্রফেসর ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে।
শিশু বিবাহের সার্বিক পরিস্থিতি উল্লেখ্য পূর্বক প্রফেসর ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে বলেন, বাংলাদেশে এখনও বাল্যবিবাহ এক বড় সামাজিক সমস্যা। সমস্যাটি একদিনের নয়। স্বাধীনতার সময়ে এদেশে বাল্যবিবাহের হার ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ। দিনে দিনে যদিও এ হার কিছুটা কমেছে, পরিসংখ্যানের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সরকারিভাবে ৫২ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে।
তবে সংখ্যার দিক থেকে ভারতের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। বাল্যবিবাহের হারে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭’ করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন উদ্যোগ হাতে নেওয়া হলেও বাল্যবিবাহ বন্ধে তা খুব বেশি কাজে আসছে না। তারপরেও বাল্যবিবাহ বেড়েই চলেছে। তাই শিশুবিবাহ ও সামাজিক সহিংসতা প্রতিরোধে নবীন-প্রবীণ ও অভিভাবকদের সমন্বিত করে জনসচেনতার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সরকার এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু সামাজিক এই সংকট মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সহযোগি প্রতিষ্ঠানসহ সকল নাগরিকের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কল্যান চৌধুরী বলেন, পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে একটা সময় আমরা অনেক আন্দোলন করেছি। এখন সে রকম আন্দোলন নেই। তবু মানুষ এ বিষয়ে এখন যথেষ্ট সচেতন। তথ্যভান্ডার তৈরির বিষয়ে আমরা জোরালো গুরুত্ব দিচ্ছি। শিশুবিবাহ রোধে একটা জাতীয় কমিটি গঠণ করা হয়েছে। সরকারের একার পক্ষে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সে জন্য সবাইকে সমষ্টিগতভাবে সহায়তা করতে হবে।
পরামর্শ সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্যে এসিডি নির্বাহী পরিচালক সালীমা সারোয়ার বলেন শিশুবিবাহ এক সামাজিক ব্যাধি। এ কারণে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, নারী শিক্ষা, ক্ষমতায়ন, আত্মনির্ভরশীলতা যা জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিশেষ করে এসডিজির ৫নং অভীষ্ট (লিঙ্গতিত্তিক সমতা ও নারীদের ক্ষমতায়ন) অর্জন বাঁধাগ্রস্থ হতে পারে। তাই সকল নাগরিকের অংশগ্রহণ ছাড়া শিশু বিবাহবন্ধ করা অত্যন্ত দুরহ। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নেও হুমকির মুখে পড়তে পারে। শিশু বিবাহের মাধ্যমে শুধুমাত্র একটি শিশুর জীবন নষ্ট হয় না, এর প্রভাব সুদূর প্রসারী, এর দায় বহন করতে হয় পরবর্তী প্রজন্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রকে।
উল্লেখ্য, পরামর্শ সভায় বাল্যবিবাহ বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা, শিশুবিবাহ রোধে বিবাহ নিবন্ধন প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, শিশুবিবাহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক, সাংস্কৃতিক চর্চা, রীতিনীতি ও আচরণের পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এছাড়াও শিশুবিবাহ প্রতিরোধ ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটির সক্রিয়, শক্তিশালী করা, শিশুবিবাহ প্রতিরোধ সংশ্লিষ্ট সব উদ্যোগে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আন্তমন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ এবং একই সাথে শিশুবিবাহের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানোর উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বক্তারা।
এছাড়াও সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন, এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি) প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. মনিরুল ইসলাম পায়েল, প্রোগ্রাম অফিসার মো. এনামুল হক, উপজেলা কো-অর্ডিনেটর মোঃ আনোয়ার হোসেন। সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন জেলার বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, আইনজীবি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, কাজী, ইমাম, পুরোহিত, শিক্ষক, এনজিও প্রতিনিধি, মিডিয়া প্রতিনিধি এবং এসিডির শিশু ও কিশোর কিশোরী দলের সদস্যবৃন্দ।
