স্টাফ রিপোর্টার-
বর্ষার শুরুতেই বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে এবার পানি বাড়তে শুরু করেছে পদ্মায়। রাজশাহী পয়েন্টে মঙ্গলবার (২২ জুন) সন্ধ্যা ৬টায় পদ্মার পানির উচ্চতা মাপা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৬ মিটার।
আর রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপৎসীমা নির্ধারণ করা রয়েছে ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। ফলে উচ্চতার এই গণিত বলছে- বর্তমানে বিপৎসীমার ৫ দশমিক ৮৪ মিটার নিচে রয়েছে পদ্মার পানি। এভাবে বাড়তে থাকলে সামনের দিনে বিপৎসীমা ছুঁই-ছুঁই করবে পদ্মার পানি।
এদিকে পদ্মার পানি বাড়তে শুরু করায় নদী ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরে এখনও ভাঙন দেখা না দিলেও রাজশাহীর চারঘাট-বাঘা, পবা ও গোদাগাড়ী এলাকায় এরই মধ্যে ভাঙন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এবার বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ফুঁসে উঠছে স্রোতস্বিনী পদ্মা নদী। কদিন আগের মরা পদ্মায় আবারও স্রোতের গর্জন শোনা যাচ্ছে। নদীর আনাচে কানাচে এখনই টইটম্বুর হয়ে উঠছে।
তাই এবার সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের আগেই তীরবর্তী মানুষের মধ্যে বাড়ছে ভাঙন আতঙ্ক। দেশের অন্যান্য নদনদীতে পানি বাড়ার সঙ্গে পানি বাড়ছে পদ্মায়ও। তাই বর্ষার শুরুতেই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন রাজশাহীর এই উপজেলাগুলোয় থাকা পদ্মার পাড়ের ভাঙন শোষিত মানুষ। প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় থেকে নদীবক্ষে পৈত্রিক ভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে এই তারা এখন নিঃস্ব!
নদী ভাঙনের শিকার এসব মানুষের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে এসব পয়েন্টে ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কখনোই স্থায়ী পদক্ষেপ নেয় না। যে কারণে বর্ষা ও ভাদ্র মাসে ফুলে ফেঁপে ওঠে পদ্মা। আর ভাঙনের মুখে পড়ে নদী তীরবর্তী মানুষ। মাইলের পর মাইল জমি, বসতভিটা, দালানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নদীতে বিলিন হয়ে যায়। পদ্মার পেটে সহায় সম্বল হারিয়ে এরই মধ্যে কয়েক হাজার পরিবার বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছেন। করেছেন পেশা পরিবর্তন। কেউ আবার জায়গা-জমি হারিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ভাঙনের কবলে পড়ে অনেকেই হয়েছেন ভূমিহীন। বছর যায়, বছর আসে। কিন্তু পদ্মার আগ্রাসী আচরণ থেকে রক্ষা মেলেনা রাজশাহীর নদীকূলের এই মানুষগুলোর।
বর্তমানে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর ও সদর ইউনিয়নের প্রায় চারটি গ্রামে ভাঙন শুরু হয়েছে। এছাড়া রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সর্ব দক্ষিণ পূর্বে থাকা সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন চকরাজাপুরেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাঘা উপজেলার সীমান্তবর্তী পদ্মা নদীর চরাঞ্চল চকরাজাপুর এখন বর্ষার পানিতে পরিপূর্ণ। তবে রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা উপজেলা এলাকায় পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে ৭২২ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। আগামী মৌসুমে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এ কাজ শেষ হলেই ভাঙন রোধ হবে বলছে- পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
এদিকে পদ্মার পানি হু-হু করে বাড়তে থাকায় ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে রাজশাহীর পবা ও গোদাগাড়ী উপজোর নদীর তীরবর্তী এলাকায়ও। এর আগে রাজশাহী মহানগর এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছিল ২০১৬ সালে। ওই সময় পদ্মা ঘেঁষে থাকা শ্রীরামপুর পুলিশ লাইন এলাকার বাঁধে তিন মিটার এলাকা জুড়ে ফাটল দেখা দেয়। যদিও তড়িঘড়ি করে জিও ব্যাগ ফেলে সে সময় কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে বাঁধের ভাঙন ঠেকানো হয়। তবে এরপর শহর রক্ষা বাঁধের ওই অংশে আর সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি। এর ওপর বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই এবার বৃষ্টিপাত হওয়ায় বিগত বছরের তুলনায় পদ্মার রাজশাহী পয়েন্টে আগেভাগেই পানি এসেছে। এতে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গেজ রিডার এনামুল হক জানান, মূলত গত ১৭ মে থেকে রাজশাহীতে পদ্মার পানি বাড়তে শুরু করেছে। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টায় রাজশাহী পয়েন্ট পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা মাপা হয়েছিল- ৮ দশমিক ৭৫ মিটার। এরপর ২৯ মে পর্যন্ত পানির উচ্চতা ছিল ৯ মিটারের মধ্যে। ৩০ মে পানির উচ্চতা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭৪ মিটারে। সর্বশেষ ২১ জুন সন্ধ্যা ৬টায় ছিল ১২ দশমিক ৬৬ মিটার। অর্থাৎ বর্তমানে রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার বিপৎসীমার (১৮ দশমিক ৫০) ৫ দশমিক ৮৪ মিটার নিচ দিয়ে প্রাবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।
তবে রাজশাহীতে বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও এর কাছাকাছি গেলেই শহর এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে তীরবর্তী মানুষগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর আগে ২০২১ সালের ২০ আগস্ট এই পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ৮৫ মিটার। যোগ করেন গেজ রিডার।
আর পরিস্থিতি যাই হোক এবারও পদ্মার পানি শহররক্ষা বাঁধ অতিক্রম করবে না।
কারণ রাজশাহীতে পদ্মার বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। আর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা শহর রক্ষা বাঁধের উচ্চতা ২১ দশমিক ৬৭ মিটার। তাই পদ্মার পানি বাড়লেও বাঁধ নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহী পওর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম শেখ বলেন, পাউবোর পক্ষ থেকে গোটা দেশের নদনদীর পানি বৃদ্ধি ও বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
গেল কয়েক বছর আগে শহরের টি-বাঁধ এলাকার অংশটা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ওই এলাকায় পানি বাড়ার বিষয়ে তারা নজর রাখছেন। আর রাজশাহীর চারঘাট-বাঘা, পবা-গোদাগাড়ীর যেসব পয়েন্টে পানি বাড়ছে সেসব এলাকার ভাঙন দেখা দিলে তার রোধের আগাম ব্যবস্থা তাদের রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন- রাজশাহী পাউবোর এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
