আলো ডেস্ক: টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত বাসচালক রাজা মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। টাঙ্গাইলের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বাদল কুমার চন্দ গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রাজা মিয়াকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মধুপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুরাদ হোসেন আদালতে হাজির করে সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করেন। বিচারক শুনানি শেষে পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালত পরিদর্শক তানভীর আহমেদ এ তথ্য জানান।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ভোরে রাজা মিয়াকে শহরের দেওলা এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা। রাজা মিয়ার কাছ থেকে দুটি ছুরি, একটি কাঁচি এবং যাত্রীদের কাছ থেকে ডাকাতি হওয়া তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজা মিয়া এ ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তার কাছ থেকে বাস ডাকাত চক্রের সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে তারা আরও কোন ডাকাতি কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে কিনা, তাদের দলের সদস্য সংখ্যা, তারা আর কি ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঈগল পরিবহনের বাসচালকের কাছ থেকে গাড়ি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর রাজা মিয়া পুরো ডাকাতির সময় গাড়ি চালিয়েছেন। মধুপুর থানার ওসি মোহাম্মদ মাজহারুল আমিন জানান, তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে রাজা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে এ ঘটনায় গতকাল শুক্রবার আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গতকাল শুক্রবার ভোরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও সোহাগপল্লী থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার তার কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন একথা জানান। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে মো. আউয়াল (৩০), একই উপজেলার শিলাবহ পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাহেজের ছেলে নুরনবী (২৬)। গ্রেপ্তারকৃতদের সবাই মাদকাসক্ত। এদিকে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের পুলিশ চিহ্নিত করতে পেরেছে বলে জানা গেছে।
এদের মধ্যে তিন/চার জন টাঙ্গাইল জেলার। বাকিরা বিভিন্ন জেলার অধিবাসী। তবে তারা বসবাস করেন গাজীপুর, চন্দ্রা ও সাভার এলাকায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজা মিয়া ডাকাতি ও ধর্ষণে অংশে নেওয়া সবার নাম-পরিচয় প্রকাশ করেছেন। পুলিশ সূত্র জানায়, তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত রাজাকে প্রথমে চিহ্নিত করা হয়। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের মধুপুরের রক্তিপাড়ায় বাসটি রাত তিনটার পর খাদে পড়ে যায়। ওই এলাকার মোবাইল টাওয়ারে ঘটনার পর কোন কোন নাম্বার থেকে কোথায় ফোন করা হয়েছে তার সন্ধান করা হয়। সেখানে একটি নাম্বার থেকে বেশ কয়েকটি নাম্বারে ফোন করার তালিকা পাওয়া যায়।
বিভিন্ন নাম্বারে ফোন করা নাম্বারটি অনুসন্ধান করে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে সেটি রাজা মিয়ার নাম্বার। পরে রাজা মিয়া এবং যে সব নাম্বারে তিনি ফোন করেছিলেন তাদের ছবি সংগ্রহ করে গোয়েন্দা পুলিশ। সেই ছবি ঈগল পরিবহনে ডাকাতির শিকার হওয়ার যাত্রী ও বাসের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে দেখানো হয়। তারা রাজা মিয়াসহ বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করেন। জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, গত এক বছরের মধ্যে এই মহাসড়কে সড়ক ডাকাতির কোনো ঘটনার ব্যাপারে মামলা হয়নি। তাই এই চক্র এর আগে এ এলাকায় আগে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার জানান, ডাকাতের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
গ্রেপ্তার হলে এ চক্রের বিষয়ে জানা যাবে। এদিকে চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন ভুক্তভোগী নারী। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রুমি খাতুন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ২২ ধারায় ওই নারীর জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। মঙ্গলবার রাতের সেই লোমহর্ষক ঘটনা বলতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ওই নারী বলেন, আমি মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে ঈগল পরিবহনের বাসে ওঠে ঢাকা যাচ্ছিলাম। সিরাজগঞ্জের তিনটি আলাদা জায়গা থেকে ১০ জনের ডাকাত দল বাসে ওঠে। ডাকাতি শুরুর আগে আমার পাশের খালি সিটে ডাকাতদের একজন বসতে চাইলে তাকে আমি বসতে দিইনি।
ডাকাতি শুরু করলে আমি তাদের বাধা দিয়েছিলাম। এ কারণে তারা আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। বাস চালকের কাছে গিয়ে তিনজন ডাকাত প্রথমে তাকে জিম্মি করে। চালকের গলায় ছুরি চেপে ধরে সিট থেকে উঠতে বলে। একপর্যায়ে তারা চালককে বেঁধে ফেলে। এ সময় তারা আমার পাশের সিটে বসা হেলপারকে তুলে নেয়। আমার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। পরে তারা আমার হাত-মুখ-চোখ বেঁধে ফেলে এবং …। তিনি আরো বলেন, ডাকাতরা যার কাছে টাকা বেশি পেয়েছে তাকে কিছু বলেনি। সবার কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ও স্বর্ণালঙ্কারসহ সব কিছু লুটে নেয়। একজন মহিলা তার স্বামীকে ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছিলেন, তার কাছ থেকে সব টাকাও তারা কেড়ে নেয়।
জবানবন্দিতে ওই নারী ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে বলেন, ঘটনার সঠিক বিচার না হলে আজ এক নারীর সঙ্গে যা ঘটেছে কাল আরেক নারীর সঙ্গেও তা ঘটবে। আমি ওদের ফাঁসি চাই। যাতে ওদের দেখে অন্যরা ভালো হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, গত মঙ্গবার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে ঈগল পরিবহনের একটি বাস নারায়নগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিরাজগঞ্জের একটি খাবার হোটেলে যাত্রা বিরতি করে। সেখান থেকে যাত্রা শুরুর পর তিন দফায় যাত্রীবেশি কয়েক জন ডাকাত বাসে ওঠে। বাসটি টাঙ্গাইল অতিক্রম করার পর ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে চালককে জিম্মি করে বাসটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
তারা যাত্রীদের হাত, পা, চোখ বেঁধে তাদের সব লুট করে নেয়। এ সময় বাসে থাকা এক নারী যাত্রী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হন। ডাকাতরা বাসটি টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের দিকে নিয়ে যায়। রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাসটি মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়া নামক স্থানে রাস্তার খাদে নামিয়ে দেয় তারা। পরে স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা যাত্রীদের উদ্ধার করে। পরে পুলিশ আসলে যাত্রীরা ডাকাতি ও নির্যাতনের বিষয়টি জানান। ওই বাসের যাত্রী হেকমত মিয়া বাদী হয়ে মধুপুর থানায় বাস ডাকাতি ও ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন।
