সাজ্জাদুল তুহিন, নওগাঁ
নওগাঁর মান্দায় গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে গনেশপুর ইউপিতে নির্বাচনী সহিংসতায় ইমরান হোসেন রানা (৪০) হত্যা মামলায় পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেনের প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা বানিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হানিফ উদ্দিন মন্ডল বলেন, ঘটনার সময় কোন চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। অথচ ঘটনাস্থলে না থেকেও আমি এক নাম্বার আসামী।
সুষ্ঠ তদন্ত না করে মনগড়াভাবে এসআই ফারুক আমাদেরকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেছেন। রাজনৈতিক বিরোধের জেরে মিথ্যা হত্যা মামলা থেকে আমাদেরকে অব্যাহতি পাইয়ে দেওয়া কথা বলে আমিসহ ১০৪ জন আসামীর কাছ থেকে ১০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের সময় প্রচার প্রচারণায় বাধা দেওয়া ও আমার ছেলেসহ কর্মী-সমর্থকদের আটকের ভয় দেখিয়ে নির্বাচনের পরবর্তী সময় ও তার প‚র্বে দফায় দফায় বিভিন্ন স্থানে মোটা অংকের অর্থ গ্রহণ করেন। আমাদেরকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এসআই ফারুক। এখন তিনি বদলি হয়ে মান্দা থানা থেকে চলে গেছেন।
মান্দা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন (বিপি- ৭৬৯৬০০৬৫৪৮) এখন গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে কর্মরত আছেন বলে তিনি জানান। এসআই ফারুকের শাস্তির দাবীতে হত্যা মামলার আসামী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হানিফ উদ্দিন মন্ডল প্রতারিত হয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ প্রেরণ করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে গত (১২ নভেম্বর ২১) ইং তারিখে নৌকা সমর্থিত প্রার্থী হানিফ উদ্দিন মন্ডল এবং বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম বাবুল চৌধুরীর লোকজনের মধ্যে মারপিট ও অফিস ভাংচুরসহ আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সে সময় আলম নামের আওমীলীগ কর্মী গুরুত্বর আহত হন। এরপর আলমের বাবা আব্দুল হামিদ বাদী হয় গত (১৫ নভেম্বর ২২ইং) তারিখে ৬০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন।
মামলার পর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ও চেয়ারম্যান প্রার্থী শফিকুল ইসলাম বাবুল চৌধুরীর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা গ্রহণ করে আসামী গ্রেফতার করেনি। তার সাথে বারবার ফোনে কথা বলতো পুলিশের এই কর্মকর্তা। দফায় দফায় কথা বলার কল হিস্ট্রি ও দুই জনের ফোন নাম্বার অভিযোগে সংযুক্ত করা রয়েছে।
গত (১২ নভেম্বর ২০২১ইং) তারিখের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘ ইমরান হোসেন রানাও গুরুতর আহত হন। ওই সময় সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়। এদের মধ্যে বিএনপি সমর্থিত কর্মী ইমরান হোসেন (রানা) বৃহস্পতিবার (১৮ নভেম্বর ২০২১ইং) তারিখে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। এরপর ইমরানের মা রেজিয়া বাদী হয়ে নৌকা সমর্থিত প্রার্থী হানিফ উদ্দিন মন্ডলকে ১নং আসামী করে ১০৪ জনের নাম উলেখসহ অজ্ঞাত ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
মামলাটি পাওয়ার পর থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠেন এসআই ফারুক হোসেন। তিনি মামলাটি সুষ্ঠ তদন্ত করে হানিফ উদ্দিন মন্ডল ও ২নং আসামিসহ ১০৪ জন আসামির কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে ১০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। হত্যা মামলার ১নং আসামী হানিফ উদ্দিন মন্ডলকে পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রতিপক্ষের একজন মারা গিয়েছে। সেই মামলায় আপনি ১নং আসামি, বিধায় আপনাকেসহ আপনার দলীয় নেতা কর্মীদের আমি বাঁচিয়ে দিবো। এই জন্য আমাকে আপাতত ৪ লক্ষ দিতে হবে।
কথা অনুযানী তার ভাড়া বাসায় গিয়ে ৩ লক্ষ টাকা দিয়ে আসি। পরবর্তীতে (২৭ নভেম্বর ২১) আমাকেসহ আওমীলীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে, মান্দা সর্কেল ও ওসি স্যারকে ম্যানেজ করতে হবে বলে আরও ৩ লক্ষ টাকা চায়। তার কথা মত উপজেলার সাহাপুর রাস্তার উপরে ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করি। এর ধারাবাহিকতায় গত (৮ মার্চ ২০২২) তারিখে রাজশাহী রানী বাজারে ৩ লক্ষ টাকা প্রদান করি। এছাড়া গত (১৫ নভেম্বর ২১) তারিখে বগুড়া ইবনেসিনা হাসপাতালের ১০ তলায় ১ লক্ষ টাকা গ্রহণ করেন।
(৩০ এপ্রিল ২০২২ ) তারিখে সতিহাট বাজারে আসামী ফারুকের নিকট থেকে ১ লক্ষ টাকা পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার জন্য দাবি করলে ৫০ হাজার টাকা দেন তিনি। একই ভাবে গত (১০ জুলাই ২২) তারিখে ঈদ-উল-আযহার জন্য ৫০ হাজার টাকা নেন। হত্যা মামলায় জাহাঙ্গীর নামে এক আসামীকে অভিযোগ থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে ১ লক্ষ টাকা দাবি করেন। সে গরীব হওয়ায় তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েও অভিযোগ থেকে নাম বাদ দেয়নি। অথচ মামলার সময় সে ছিলোনা।
এছাড়া এলাকায় বিভিন্ন অপরাধ করে ধামাচাপা দিয়ে গেছেন এসআই ফারুক। চুরির মামলার ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে শ্রীরামপুর গ্রামের শ্রী বিষ্ণপদ, মিনহাজ, গোবিন্দপুর গ্রামের হেলাল, কা ন গ্রামের রাজুকে হয়রানি মূলক গ্রেফতার করে সবার কাছ থেক ১ লক্ষ টাকা দাবি করেন। পরে তারা দিতে না চাইলে সবার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেন।
পুলিশে চাকরি করে তার ও স্ত্রীর নামে বেনামে টাঙ্গাইল,গাজীপুরসহ ঢাকায় জমি ও প্লট আছে বলে অভিযোগে উলেখ করা হয়েছে । এবং আয় বহির্ভ‚ত বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছে তিনি। সতিহাট বাজারের সাইকেল দোকানদার মোতালেব হোসেন কম ম‚ল্যে জমি কেনার কারণে তাকে বিভিন্ন লোক দিয়ে হুমকি দিয়ে তার নিকট থেকে দবির উদ্দিন,সাদ্দাম হোসেন, মাসুদ রানাসহ অনেক দোকানদারের সামনে ২লক্ষ টাকা গ্রহণ করেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মান্দা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করছে তা সঠিক নয়। তবে টাকার গ্রহণের বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করেন নি। এ ব্যাপারে মান্দা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মতিয়ার রহমান বলেন, এবিষয়ে কোন কিছু জানি না।
