আলো ডেস্ক: সকলের কল্যাণ, দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি কামনায় আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হল তাবলিগ জামাতের তিন দিনের সম্মিলন বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব। গতকাল রোববার বেলা সোয়া ১২টা থেকে আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন ভারতের মাওলানা ইউসুফ বিন সা’দ কান্ধলভী। আধা ঘণ্টার এই মোনাজাত টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এদিন ফজরের পর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা মুরসালিন, এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইজতেমার শেষ দিনের কার্যক্রম। তার বয়ান তর্জমা করে শোনান বাংলাদেশের মাওলানা আশরাফুল। বয়ানের পর নাস্তার বিরতি দিয়ে ৯টা থেকে মাওলানা মোশাররফ তালিমের বয়ান করেন।
সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হয় হেদায়েতি বয়ান। হেদায়তি বয়ানের পর হয় আখেরি মোনাজাত। প্রতিবছর বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেয় কয়েক লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে তাবলিগ জামাতের বিদেশি অনুসারী থাকেন ৩০ থেকে ৪০ হাজার। তাবলিগ জামাতের নিয়মিত অনুসারী নন, এমন অনেকও বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে শামিল থাকতে চান। গত শুক্রবার আম বয়ানের মধ্য দিয়ে এবারের বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। এই পর্বে অংশ নেন দিল্লির মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর অনুসারীরা। এর বাইরে শুধু আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসতে থাকে গত শনিবার থেকেই। বাস, ট্রাক, কার, মাইক্রোবাস, ট্রেন, লঞ্চে করে এসে টঙ্গীতে পৌঁছে অবস্থান নিতে শুরু করেন। রাজধানীসহ আশপাশের এলাকার লোকজন শীত আর কুয়াশা উপেক্ষা করে রাতেই টঙ্গীমুখো হন।
মধ্যরাত থেকে টঙ্গীমুখী সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় ১৫ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটেও ইজতেমা মাঠে পৌঁছেছেন অনেকে। ইজতেমার মাঠে যাদের জায়গা হয়নি, আশপাশের বাসাবাড়ি, ভবন, ভবনের ছাঁদ কিংবা করিডোর, সড়কের পাশে ফুটপাতে এমনকি গাছতলায় বসে তারা মোনাজাতে হাত তুলেছেন। বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের মিডিয়া সমন্বয়ক মোহাম্মদ আবু সায়েম বলেন, গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত আরব, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স ৬২টি বিভিন্ন দেশ থেকে ৭ হাজার ৯২১জন বিদেশি মেহমান বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিয়েছেন। মূল ইজতেমা ময়দানে নারীদের বসার কোনো ব্যবস্থা নেই।
সে কারণে ময়দানের বাইরে খালি জায়গায়, কলকারখানা ও বসত বাড়ির ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন বহু নারী। এবার কাকরাইলের মাওলানা জোবায়েরের অনুসারীরা ১৩-১৫ জানুয়ারি প্রথম পর্বে ইজতেমায় অংশ নেন। মাওলানা সা’দ এর অনুসারীদের অংশগ্রহণে গতকাল রোববার দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হল তাবলিগ জামাতের এই বিশ্ব সম্মেলন। আগে এক মঞ্চ থেকেই একবারই বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন হতো। কিন্তু মাওলানা জোবায়ের এবং মাওলানা সা’দ পক্ষের অনুসারীরা এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে দুই পক্ষ বিশ্ব ইজতেমা দুইবারে করার সিদ্ধান্ত নেয়।
টঙ্গীর তুরাগ তীরে দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের বিশ্ব ইজতেমা। মোনাজাতের পরপরই নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার জন্য মানুষের ঢল নামলে পরিবহন সংকটে ভোগান্তিতে পড়েন তারা। গতকাল রোববার ভোর থেকেই মোনাজাতে অংশ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ইজতেমাস্থলে আসতে শুরু করেন। তখনও গাড়ি না পেয়ে অনেকে পায়ে হেঁটেই তুরাগতীরে পৌঁছান। এত মানুষের ভীড়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় পুরো টঙ্গী এলাকা। ময়দানে স্থান না পাওয়ায় কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে পলিথিন, খবরের কাগজ বিছিয়ে দুপুরে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন তারা। অনেকেই আবার মোবাইল ফোনে দূর-দূরান্ত থেকেও মোনাজাতে শরিক হন। বিশ্ব ইজতেমার মিডিয়া সমন্বয়ক মোহাম্মদ আবু সায়েম জানান, বেলা ১২টা ১৫ মিনিটে আখেরি মোনাজাত শুরু হয়ে তা ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। এর পরপরই মোনাজাতের উদ্দেশ্য আসা মুসলমানরা ইজতেমা এলাকা ছাড়ছেন।
তবে খিত্তায় অবস্থান নেওয়া তাবলীগের অনুসারীরা পর্যায়ক্রমে ময়দান ছাড়বেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আজ সোমবার পর্যন্ত ময়দানে অবস্থান করবেন। তিনি আরও জানান, আখেরি মোনাজাতে দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মার সুদৃঢ় ঐক্য, আখেরাত ও দুনিয়ার শান্তি কামনা করা হয়। এ সময় দুহাত তুলে আল্লাহ’র দরবারে ফরিয়াদ জানায় লাখ লাখ মানুষ। মোনাজাতের পরপরই নিজ গন্তব্যে ফেরার জন্য রওয়ানা হন এসব মানুষ। ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী-পুবাইল, টঙ্গী-বনমালা আঞ্চলিক সড়ক, টঙ্গী-আব্দুল্লাহ্পুর সড়ক ও কামারপাড়া-আশুলিয়া সড়কে জনস্রোতের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ফেরার পথে দুই-একটি পিক আপ ও মোটরসাইকেল ছাড়া অন্য কোনো গাড়ি না পেয়ে আবারও পায়ে হেঁটেই বাড়ির দিকে রওনা হন তারা। ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে আসা মো. ইয়াকুব আলী জানান, আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে গত শনিবারই ইজতেমা ময়দানে এসেছেন। মোনাজাত শেষে ফেরার পথে পরিবহন সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি। আশুলিয়া থেকে আসা সামসুল ইসলাম বলেন, “সকালে ইজতেমা ময়দানে আসতে তেমন ঝামেলা হয়নি। বাসেই কামারপাড়া নেমে আখেরি মোনাজাত শেষ করেছি। “কিন্তু ফেরার সময় কোনো গাড়ি না পেয়ে পায়ে হেঁটেই রওনা দিয়েছি। এতে কষ্ট হলেও লাখো মুসল্লির সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করতে পেরে ভাল লাগছে।” গাজীপুরের কাপাসিয়ার বাসিন্দা মো. শাহ জালাল বলেন, লাখো মানুষের সঙ্গে হাঁটতে পেরে ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে।
