আলো ডেস্ক: গাজীপুর সিটি করপোরেশন (গাসিক) নির্বাচনের সঙ্গে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে তলবের কোনো সম্পর্ক নেই বলে মন্তব্য করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সচিব মো. মাহবুব হোসেন। গতকাল বুধবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। দুদক সচিব বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে জাহাঙ্গীর আলমের বিষয়ে ২০২০ সালের একটি অভিযোগ ও ২০২২ সালের আরেকটি অভিযোগ নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়। অভিযোগসংশ্লিষ্ট বিষয়ে এরইমধ্যে অনেকের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। অনেক কাগজপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। অনুসন্ধানের শেষপর্যায়ে তার (জাহাঙ্গীর আলম) বক্তব্য প্রয়োজন।
এ কারণেই তাকে তলব করা হয়েছে। এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া অ্যাকাউন্টে লেনদেন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গাজীপুরের বরখাস্ত মেয়র জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুদক। এক নোটিশে আগামী ২১ ও ২২ মে দুদক প্রধান কার্যালয়ে তাকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। গতকাল বুধবার (১৭ মে) দুদকের প্রধান কার্যালয় সূত্রে বিষয়টি জানা গেছে। দুদক সচিব বলেন, প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের গাজীপুরের কোনাবাড়ী শাখায় ‘মেয়র, গাজীপুর সিটি করপোরেশন’ নামে একটি ভুয়া অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। সেই হিসাব সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানদল গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে অভিযোগসংশ্লিষ্ট যাবতীয় রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেছে। চারজন ব্যাংক কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জনের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০, ২০২০-২১ অর্থবছরে যেসব পূর্তকাজের আরএফকিউ দেওয়া হয়েছে, সে সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। হাট-বাজার ইজারা ও অন্যান্য রাজস্ব খাত থেকে যে রাজস্ব আদায় হয়েছে, সে সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। কনজারভেন্সি খাতে কী কাজ হয়েছে বা কীভাবে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে সে সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক- বলেন মাহবুব হোসেন।
তিনি আরও বলেন, সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম দায়িত্বে থাকা অবস্থায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের রাজস্বখাতভুক্ত যেসব ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হয়েছে, সে সংক্রান্ত তথ্য ও করোনা মহামারির সময়ে করোনা প্রতিষেধক ও খাদ্যসামগ্রী কেনার নামে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে কি না, তার রেকর্ডপত্র এবং ২০১৮ ও ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমার মাঠে বিভিন্ন খাতে ব্যয়-সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিযোগসংশ্লিষ্ট অন্যান্য রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেছে অনুসন্ধানদল। গত মঙ্গলবার দুদক থেকে পাওয়া দুটি তলবি নোটিশ গ্রহণ করেন জাহাঙ্গীর। গত সোমবার দুদকের উপ-পরিচালক মো. আলী আকবরের সই করা পৃথক দুটি নোটিশ গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়রের ঠিকানায় পাঠানো হয়।
বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎসহ ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে তাকে তলব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আগামী ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশন (গাসিক) নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর। দল মনোনয়ন দিয়েছে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খানকে। দলের ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে মেয়র পদে প্রার্থী হলেও যাচাই-বাছাইয়ে জাহাঙ্গীরের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। তবে তার মা জায়েদা খাতুনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়।
মায়ের পক্ষে নির্বাচনের মাঠে নামায় জাহাঙ্গীরকে গত সোমবার আওয়ামী লীগ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। এর আগে গত বছরের জুন মাসে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎসহ ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। একইসঙ্গে দুই সদস্যের টিম গঠন করা হয়। ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বহিষ্কার করে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
প্রজ্ঞাপনে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া দরপত্র, নির্দিষ্ট কোম্পানিকে দর দেওয়ার অনুরোধ সংক্রান্ত (আরএফকিউ) দরপত্রে অনিয়ম, বিভিন্ন পদে অযৌক্তিক লোকবল নিয়োগ, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ও একই কাজ বিভিন্ন প্রকল্পে দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, প্রতি বছর হাটবাজার ইজারার টাকা যথাযথভাবে নির্ধারিত খাতে জমা না রাখাসহ বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া ভ‚মি দখল ও ক্ষতিপূরণ ছাড়া রাস্তা প্রশস্তকরণ সংক্রান্ত অভিযোগও রয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, উল্লিখিত অভিযোগগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার, বিধিনিষেধের পরিপন্থি কার্যকলাপ, দুর্নীতি ও ইচ্ছাকৃত অপশাসনের শামিল, যা সিটি করপোরেশন আইনানুযায়ী অপসারণযোগ্য অপরাধ।
এরইমধ্যে এসব অভিযোগের তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন অপসারণের কার্যক্রমও শুরু করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়রের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। এর আগে ওই বছরের ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়।
