আলো ডেস্ক: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদ শূন্য ঘোষণা ও নির্বাচন নিয়ে রিট খারিজের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে অযৌক্তিকভাবে রিট করায় আবেদনকারী আইনজীবী এম এ আজিজ খানকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। জরিমানার এ অর্থ কোথায় বা কাকে দিতে হবে আদেশে তা উল্লেখ করা না হলেও আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, খরচা হিসেবে জরিমানার ১ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে লিভ টু আপিলকারীকে বলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আট সদস্যের আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী এম এ আজিজ খান। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ (এ এম) আমিন উদ্দিন। রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনকে নির্বাচিত ঘোষণা করে গত ১৩ ফেব্রæয়ারি নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ প্রজ্ঞাপনের কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে গত ৭ মার্চ একটি রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এ আজিজ খান।রিটে নতুন করে নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্রপতি পদ খালি রাখা নিশ্চিতের আর্জি জানানো হয়। রিট আবেদনে আজিজ খান বলেন, ২০০৪-এর ধারা ৯ অনুযায়ী মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ করা যাবে না।
কারণ, তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন অবসরপ্রাপ্ত কমিশনার এবং রাষ্ট্রপতির পদটি লাভজনক। মো. সাহাবুদ্দিন ২০০৪ সালের দুদক আইনের ৯ ধারায় অনুসারে কর্মাবসানের পর কোনো কমিশনার প্রজাতন্ত্রের কার্যে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না। তবে যাচাই-বাছাই শেষে ইসি রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন বৈধ বলে গণ্য করে। ইসি বলেছে, ‘নির্বাচিত’, ‘নিয়োগ’ নয়, যা আইনের ভুল ব্যাখ্যা। ‘নিয়োগ’ ও ‘নির্বাচিত’ সমার্থক শব্দ- এ যুক্তিতে রিটটি করা হয়েছিল। ১৫ মার্চ বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন।
ওইদিন অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ (এ এম) আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, রিটটি সরাসরি খারিজ হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনকে নির্বাচিত ঘোষণা করে ইসির জারি করা প্রজ্ঞাপন বৈধ। এর আগে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের ১২ মার্চের কার্যতালিকায় ছিল রিটটি। তবে বেঞ্চের একজন বিচারপতি আহমেদ সোহেল রিটটি শুনতে বিব্রত বোধ করেন। ওইদিন এ বিচারপতি বলেন, প্রায় পাঁচ বছর তিনি দুদকের আইনজীবী ছিলেন। তাই বিষয়টি শুনতে বিব্রত বোধ করছেন। এরপর বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটি শুনানি না করে প্রধান বিচারপতি বরাবর পাঠিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন।
পরবর্তীতে রিটটি বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানির জন্য নির্ধারণ করে দেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি পদে সাহাবুদ্দিনকে নির্বাচিত ঘোষণা সংক্রান্ত ইসির প্রজ্ঞাপন নিয়ে আবদুল মোমেন চৌধুরী, কে এম জাবিরসহ সুপ্রিম কোর্টের ছয় আইনজীবী গত ১২ মার্চ পৃথক রিট করেন। ১৩ মার্চ বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চে এ রিটটি জমা দেওয়া হয়।
১৫ মার্চ বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটি সরাসরি খারিজ করে আদেশ দেন। ওইদিন পৃথক দুটি রিটের ওপর শুনানি নিয়ে সেগুলো খারিজ করেন হাইকোর্টের একই বেঞ্চ। রিট দুটি খারিজ করে হাইকোর্ট অভিমত দেন, রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ‘দ্য অফিস অব প্রফিট’ ধারণ করেন, কিন্তু এটি প্রজাতন্ত্রের কর্মে একটি লাভজনক (অফিস অব প্রফিট) পদ নয়। রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণের পদ্ধতি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে অন্যান্যের নিয়োগের মতো নয়। তদুপরি প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য কর্মে নিয়োজিত কর্মচারীদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের যেসব বিধান ও নিয়ম রয়েছে, সেগুলো রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
পরে ওই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন রিটকারী আইনজীবী এম এ আজিজ খান। সবশেষ গত ১৫ মে রিটটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওঠে। আবেদন ভ্রান্ত ধারণা প্রসূত উল্লেখ করে ওইদিন চেম্বার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম আবেদন নামঞ্জুর করে লিভ টু আপিল ১৮ মে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বৃহস্পতিবার লিভ টু আপিলের ওপর শুনানি হয়। ওইদিন চেম্বার বিচারপতি বলেন, যারা এ ধরনের রিট করেন তাদের জরিমানা করা উচিৎ। প্রথমে ১ লাখ টাকা জরিমানা করলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেন আদালত। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার আর শেষ রক্ষা হয়নি এ আইনজীবীর।
লিভ টু আপিল খারিজসহ তাকে জরিমানাও করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হয় গত ২৩ এপ্রিল। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ এপ্রিল দায়িত্বভার নেন। এর আগে মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচন প্রক্রিয়া যথাযথ হয়নি দাবি করে গত ২৬ ফেব্রæয়ারি একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এ আজিজ খান। সে নোটিশের পরও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় এ রিট করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিনকে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে ইসি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ৭ ধারা অনুসারে তাকে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত ঘোষণা করে ১৩ ফেব্রæয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
