আলো ডেস্ক: ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সংকট সমাধানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংগঠনের সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনী বছরে কোনোভাবেই এমন বাজেট হতে পারে না। এটা অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তবায়নযোগ্য। এটা অবশ্যই সংশোধন করতে হবে। গতকাল রোববার দুপুরে গুলশানের লেকশোর হোটেলে ‘সিপিডি বাজেট ডায়ালগ-২০২৩’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট মূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে বলে মনে হচ্ছে। ফলস্বরূপ বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে অত্যধিক মুদ্রাস্ফীতি। চলমান সংকট মোকাবিলায় বাজেট ব্যবস্থায় প্রতিফলন হয়নি।
প্রস্তাবিত বাজেট চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সংকট সমাধানে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ¦ালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বড় বাজেট দিয়ে সরকার খুশি হলেও আমরা আতঙ্কগ্রস্ত। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত অভিঘাতে আছে। এই খাতে এক ধরনের লুণ্ঠনমুখী ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা বর্তমানে বিদ্যুতের কষ্ট রয়েছি। ডিসিসিআই সভাপতি ব্যারিস্টার সামির সাত্তার বলেন, রক্ষণশীল বিনিয়োগের বছর চলছে।
এই সময়ে শ্রমিকের মজুরির চাহিদা পূরণের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করলে মুদ্রাস্ফীতির বাজারে কিছুটা সাহায্য করবে বলে মনে করি। সেমিনারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নন-প্রফিট এনজিওগুলোকে কোম্পানি আইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শহরের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর দিতে পারলেও কীভাবে একটি গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্পোরেট কর দেবে? এটা কেমন শিক্ষাবন্ধব বাজেট হলো? এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বাজেট পাসের আগে আয়কর আইন পাস করা হচ্ছে। এটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
আইনের সঙ্গে অর্থবিলের সম্পর্ক নেই। কেন এটা করা হচ্ছে, আমরা বোধগম্য নয়। শ্রমিকনেতা তাসলিমা আখতার বলেন, মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ১০ শতাংশের উপরে। সামাজিক সুরক্ষাখাতে বরাদ্দ কমানোর কথা বলা হয়েছে। মালিকরা কর ও ব্যবসায় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেলেও শ্রমিকরা বঞ্চিত। শ্রমিকের স্বার্থে সামাজিক সুরক্ষাখাতে বরাদ্দ না কমিয়ে বাড়ানো দরকার। এদিকে নতুন আয়কর আইনে এনজিওকে কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোম্পানি করের আওতায় আনার সমালোচনা করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দালাল শ্রেণি তৈরি করছে। আলোচনায় তিনি আরও বলেন, কোম্পানি কী করে নট ফর প্রফিট প্রতিষ্ঠানে ঢুকে গেলো তা বুঝতে পারছি না। রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, খাতা কিনতে হয় শিক্ষার্থীদের। সেখানে কলমের ওপর আমরা ট্যাক্স বসিয়ে দিয়েছি।
সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রামগুলোর বরাদ্দ ১০.৮ শতাংশ কমেছে। বুঝলাম সেখানে আইএমএফের একটা ইনস্ট্রাকশন ছিল। তিনি আরও বলেন, দালালের দৌরাত্ম্যে হাসপাতালে ঢুকতে পারে না সাধারণ মানুষ। সেই দৌরাত্ম্য বার্থ রেজিস্ট্রেশন (জন্মনিবন্ধন) থেকে সব জায়গায়। এটা তো জনপ্রতিনিধিদের জানার কথা। তাহলে এনবিআর কী করে ব্রোকার ক্লাস তৈরি করে। প্রস্তাবিত আয়কর আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অবাক বিস্ময়ে, হতভম্ব হয়ে লক্ষ্য করলাম কোম্পানি অ্যাক্ট বিশাল বিশাল পরিবর্তন তারা নিয়ে আসলো।
সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, সমিতি, নট ফর প্রফিট সবকিছুই ঢুকে গেছে। প্রতিটি আইনে তো একটা স্পিরিট থাকে। কোম্পানি অ্যাক্টে কী করে নট ফর প্রফিট কোম্পানিতে ঢুকে গেলো। আজ সেটা সংসদে তোলা হচ্ছে। এটা কী করে হলো, কার মাথা থেকে এসেছে জানি না, কী লাভ হবে? তিনি বলেন, ভিকারুননিসা স্কুল সেটা দিতে পারবে। গ্রামের একটা স্কুল তো দিতে পারবে না। তাকে যদি কোম্পানি আইনের অধীনে ঢোকাই দেন তাহলে সে কী করে করপোরেট ট্যাক্স দেবে।
যদি কোনো ইনকাম না থাকে তাও ০.৬ শতাংশ দিতে হবে। এটা কী জন্য আসলো। আমরা বুঝতে পারছি না। শিক্ষাবান্ধব সরকার বলা হচ্ছে, তবে এটা কোনদিক থেকে শিক্ষাবান্ধব হল বুঝতে পারছি না। তিনি বলেন, এই ট্যাক্সবেজ বাড়াতে আর কি কোনো উপায় ছিল না। নট ফর প্রফিটের কাছ থেকে যদি ০.৬ নেওয়া হয় নেট রিসিটের ওপর তাহলে ৪০-৪৫ কোটি টাকা বাড়বে। হাজার হাজার কোটি টাকা আমরা ধরতে পারি না আর এই ৪০-৪৫ কোটি টাকা নেবো ট্যাক্সবেজ বাড়ানোর নামে। ঠিক আছে, সরকারের কাছে একটা অনুরোধ আমরা অনুদান এনজিওরা এখন সরকারের কাছ থেকে অনুদান নেবো। সেটা সরকার বাজেটে ব্যবস্থা করবে।
এ প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনী বছরে এমন একটা পদক্ষেপ হতে পারে না। এটা কোনো রাজনীতির মধ্যেই পড়ে না। আমরা বিশ্বাস করি- আলোচনার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন এটা একটা অবৈজ্ঞানিক, অরাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক পদক্ষেপ। যেটার সঙ্গে দেশের এসডিজি বাস্তবায়ন, এফডিসির উত্তরণ যে কোনো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাংঘর্ষিক। এসময় পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, এটা ড্রাফট। আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
