আলো ডেস্ক: দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে নিয়ন্ত্রণ ও জটিলতা কমানোর (ডিরেগুলেশন) উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। একইসঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা, বিলম্ব কিংবা অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা যাতে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য একটি বিশেষ ওয়েবসাইটও চালু করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে হবে এবং এটি এখন আর বিকল্প নয়, বরং বাধ্যবাধকতা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে যেসব নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে একটি হাই-পাওয়ার্ড টাস্কফোর্স সার্বক্ষণিক তদারকি করবে। তিনি বলেন, নতুন বিনিয়োগ নীতিমালা কোথায় লঙ্ঘিত হচ্ছে, কে বাধা সৃষ্টি করছে কিংবা কোথায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে-এসব বিষয় টাস্কফোর্স নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানালে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ডিরেগুলেশন কার্যকর করতেই হবে। এটি বাস্তবায়নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। কোনও সেবা নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন না হলে কেন বিলম্ব হলো, কার কারণে হলো-তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বা ‘পিপলস ইকোনমি’ বাস্তবায়ন শুধু সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য বেসরকারি খাত, এনজিও এবং বিভিন্ন অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বরিশালের কোনও প্রান্তিক নারী যদি শীতলপাটি তৈরি করেন, তাহলে সেই পণ্যের নকশা উন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে ৭০০ টাকার পণ্যকে ২ হাজার টাকার পণ্যে রূপান্তর করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় ডিজাইন সেন্টার প্রতিষ্ঠার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ত করা হবে এবং প্রতিটি কর্মসূচির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ থাকবে। শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ নয়, সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়নও শুরু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এই সরকার প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে। কৃষক কার্ড কর্মসূচিরও পাইলট কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। আমরা কোনও বিষয়কে শুধু নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতে এক বছরের প্রকল্প শেষ হতে সাত থেকে দশ বছর পর্যন্ত লেগেছে এবং এতে ব্যয়ও বহুগুণ বেড়েছে। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। এ জন্য একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরগুলো থেকে প্রকল্পের অগ্রগতি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো প্রকল্প পিছিয়ে পড়লে বা ব্যর্থ হলে তার কারণ ও দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্যও সেখানে দৃশ্যমান হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারব কিনা, তা সময়ই বলবে। তবে যদি ঘোষিত কর্মসূচির ৮০ শতাংশও বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ-সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকা- বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গতকাল শুক্রবার বিকালে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর আগের অবস্থায় নেই। বিভিন্ন দেশ আগের অর্থনৈতিক ধারা থেকে সরে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত-প্রতিনিয়ত নতুন সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকা- বিকৃত হচ্ছে এবং পরিকল্পিত অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ-বিগ্রহ এখন নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাব থেকে কোনও দেশই পুরোপুরি মুক্ত নয়। আমরা অতীত থেকে যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তা আরও জটিল হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও দর্শনের বিষয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বাজেট তৈরির সময় ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র এবং নৈতিক ভিত্তির ওপর রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অপচয়নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর ব্যয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যেই আগামী দিনের প্রকল্প ও ব্যয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে চারটি মূল মানদ- নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রতিটি প্রকল্প মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভ্যালু ফর মানি (ব্যয়ের যথাযথ মূল্য), রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (বিনিয়োগের প্রতিফল), কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনা- এই চারটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এসব মানদ-ের ভিত্তিতেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিতে চান। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। সেই বিশ্বাস থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখা হয়েছে। বাজেট উপস্থাপনার সময় সাংবাদিকদের ধৈর্য ও আগ্রহের প্রশংসা করে তিনি বলেন, চার ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বাজেট অধিবেশন চললেও উপস্থিত সবাই মনোযোগ দিয়ে তা অনুসরণ করেছেন। এটি গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক একটি লক্ষণ বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। এদিকে, দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস তৈরির লক্ষ্যে পর্যটনের সঙ্গে থিয়েটার, সংগীত, চলচ্চিত্র ও শিল্পকলাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দিতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ পর্যটনের সম্প্রসারণ স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বিনোদন খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সিনেমা, সংগীত ও থিয়েটারের মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘সফট পাওয়ার’ গড়ে তোলার বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু বিদেশি পর্যটকের ওপর নির্ভর না করে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের জন্য বিনোদনের সুযোগ বাড়ানো গেলে তা অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। বর্তমানে দেশে বিনোদনের সুযোগ সীমিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, থিয়েটার, ডিজাইন, আর্ট এবং মিউজিকের মতো সৃজনশীল খাতগুলোকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’র আওতায় আনা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানান, ঢাকার বাইরে একটি বিশেষ ক্রিয়েটিভ হাব বা সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ৮০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে টেকসই করতে হলে সেগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বা ‘মনিটাইজ’ করতে হবে। মিউজিক, থিয়েটার কিংবা ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে সেগুলো সংরক্ষণ করা কঠিন হবে। এ লক্ষ্যেই তরুণ শিল্পী ও সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশ সিনেমা, গান ও থিয়েটারের মাধ্যমে নিজেদের সফট পাওয়ার গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশও সেই পথে এগোতে চায়। এর ফলে একদিকে পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হবে বলেও উল্লেখ করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক, অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
