স্টাফ রিপোর্টার
রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৪৩ জন জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। তবে সরকারি নথিপত্র বলছে, পুরো নিয়োগ ও ক্রয় কার্যক্রম নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের লিখিত নির্দেশনা, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) অনুমোদন এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একাধিক সিদ্ধান্ত, অনুমোদন ও সুপারিশের ভিত্তিতে সম্পন্ন একটি প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেন শুধু মাঠপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া হলো।
নথিপত্রে দেখা যায়, নিয়োগ কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্দেশনা, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং কেন্দ্রীয় অনুমোদন ছিল। অন্যদিকে ঘুষের অভিযোগ সামনে এলেও এখন পর্যন্ত তার পক্ষে কোনো সরকারি নথি, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে তদন্তের পরিধি, দায় নির্ধারণের ভিত্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় দেশের সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার জন্য আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগসংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। একই দিনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) ই-জিপির পরিবর্তে অফলাইনে ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) অনুসরণের অনুমোদন দেয়। নির্দেশনায় ৩০ জুনের মধ্যে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বলা হয়।
এরপর ২৪ জুন মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদন, ২৫ জুন দরপত্র আহ্বান, ২৭ জুন মূল্যায়ন কমিটির সভা ও প্রতিবেদন এবং ২৯ জুন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অনুমোদনের পর কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডকে কার্যাদেশ (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) দেওয়া হয়। একই দিনে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের জন্য ৫ জন চালক, ৬৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ৬৯ জন নিরাপত্তা প্রহরীসহ মোট ১৪৩ জন জনবল সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পৃথক নির্দেশনায় আগে থেকেই কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়। সে অনুযায়ী ১৩৭ জন কর্মরত কর্মীর তালিকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি ১৪৩ জনের চূড়ান্ত তালিকা জমা দিলে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে তারা কর্মস্থলে যোগ দেন।
সম্প্রতি একটি ইউটিউবভিত্তিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে এবং কোনো লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করে।
তবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে নিয়োগ কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপের অনুমোদন, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, কার্যাদেশ ও চুক্তিপত্রের তথ্য পাওয়া গেলেও চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের সমর্থনে কোনো লিখিত নথি, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে অভিযোগ উত্থাপনকারী ইউটিউবভিত্তিক প্রতিবেদনেও অর্থ লেনদেনের পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য নথি বা তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এখন তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। গত ২১ জুলাই নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব (শৃঙ্খলা) সালাহউদ্দীন আহমদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে তিন সদস্যের এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) ডিএম আতিকুর রহমানকে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদেশে উল্লেখ করা হয়, রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা (সাময়িক বরখাস্তকৃত) মো. আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে রাজশাহী অঞ্চলে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ১৪৩ জন কর্মী নিয়োগে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ওই অভিযোগ সরেজমিনে তদন্তের জন্য কর্তৃপক্ষ এ কমিটি গঠন করেছে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা-সব বিষয়ই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
নথিপত্রে আরও দেখা যায়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, মূল্যায়ন কমিটি এবং জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে শুধু আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ কারণে তদন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা সমানভাবে মূল্যায়ন করা হবে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ২০ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী জনস্বার্থে মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় কার্যক্রম চলাকালে তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিসে কর্মরত আউটসোর্সিং চালক ইসমাইল হোসেন বলেন, তিনি ২০১৬ সাল থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যোগদানপত্র সংগ্রহ করেছেন। এ প্রক্রিয়ায় তাঁর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি এবং কেউ টাকাও দাবি করেনি।
বোয়ালিয়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ফারুক হোসেন বলেন, তিনি ২০২৩ সালে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। ২০২৫ সালের নীতিমালায় অভিজ্ঞ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান অনুযায়ী পুনরায় নিয়োগ পেয়েছেন। এ নিয়োগেও তাঁর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি।
রাজপাড়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সাব্বির হোসেনও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেন, নতুন কাউকে নিয়োগ না দিয়ে আগের কর্মীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রেও কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি।
কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসাইন বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা এবং কেন্দ্রীয় অনুমোদনের ভিত্তিতেই আগের কর্মীদের বহাল রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে কোনো তালিকা তৈরি করেনি; নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তালিকা অনুযায়ীই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠানের অগোচরে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ নিয়ে থাকলে তার দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, সরকার নির্ধারিত নীতিমালা ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই পুরো নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটেনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্তের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা, বিপিপিএর অনুমোদন, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং ঘুষের অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ-সবকিছু সমান গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করেই দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ, পুরো প্রক্রিয়াটি যদি একাধিক স্তরের সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তেও সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরের ভূমিকা মূল্যায়ন হওয়া উচিত। অন্যথায় প্রশ্ন থেকেই যাবে-বহুস্তরের অনুমোদনে সম্পন্ন একটি প্রক্রিয়ার দায় কেবল একজন কর্মকর্তার ওপরই বর্তানো হচ্ছে কি না।
