স্টাফ রিপোর্টার
রাজশাহী মহানগরীর বিলসিমলা এলাকায় যৌথ উদ্যোগে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে চাঁদা দাবি, প্রাণনাশের হুমকি, মারধর ও অপহরণের অভিযোগ তুলেছেন ১৮ জন অংশীদার। তাঁদের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী কিনতে রাজি না হওয়ায় শুরু থেকেই নির্মাণকাজে বাধা দিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলী। একপর্যায়ে সাইট ম্যানেজারকে মারধর ও অপহরণ করে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। পরে নির্মাণকাজ চালু রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশনা পাওয়ার পরও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে দাবি ভবন মালিকদের।
এ ঘটনায় মাহবুব আলীকে প্রধান অভিযুক্ত করে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) রাজপাড়া থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভবন মালিকদের পক্ষ থেকে তহুরুল ইসলাম। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা চাঁদা দাবি ও অপহরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাহবুব আলী। তাঁর দাবি, ভবনটি নির্মাণে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) নিয়ম মানা হয়নি এবং রাস্তা ও এজমালি সম্পত্তির জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়নি বলেই তিনি অভিযোগ করেছেন।
ভবন মালিকদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ২৮মে রাজপাড়া থানার নতুন বিলসিমলা এলাকার বহরমপুর মৌজায় চার কাঠা জমি কেনেন ১৮ জন অংশীদার। সেখানে নয়তলা ভবন নির্মাণ শুরু হলে মাহবুব আলী তাঁর ভাই, ভাতিজা, ভাগ্নেসহ ১০ থেকে ১৫ জনকে নিয়ে কাজে বাধা দেন। শুরু থেকেই নিম্নমানের রড, সিমেন্ট, ইট ও পাথর তাঁদের কাছ থেকে কেনার জন্য সাইট ম্যানেজারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। পাশাপাশি পাইলিংয়ের কাজও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
অভিযোগ অনুযায়ী, নির্মাণসামগ্রী কেনার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ২০২৫ সালের ৭ মার্চ সাইট ম্যানেজার শিহাব উদ্দিনকে মারধর করা হয়। পরে তাঁকে মোটরসাইকেলে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয়দের সহায়তায় ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাঁকে ছাড়িয়ে আনা হয় বলে দাবি ভবনমালিকদের। এ ঘটনার পর আতঙ্কে চাকরি ছেড়ে চলে যান শিহাব।
এরপর সজীব নামের আরেকজনকে সাইট ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করা হলে ২০২৬ সালের ১২ জুলাই আবারও বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এ সময় ভবনমালিকেরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তাঁদের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ তাঁদের।
ভবন মালিকদের একজন অংশীদার মহিবুল ইসলাম বলেন, মাহবুব আলীর বাড়ির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণাধীন ভবন থেকে প্রায় ১০ ফুট পূর্ব দিকে অবস্থিত। তাঁর দাবি, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই মাহবুব বিভিন্নভাবে বাধা দিয়ে আসছেন। নির্মাণকাজ বন্ধের উদ্দেশ্যে আরডিএতে অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টিও তাঁরা চাঁদা দাবির ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন।
ভবনমালিকদের দাবি, নির্মাণকাজে বাধা ও চাঁদা দাবির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা ১৭ জুলাই ২০২৬ রাজপাড়া থানায় অভিযোগ করেন। তাঁদের কাছে সংশ্লিষ্ট ঘটনার ভিডিও ফুটেজও সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন।
আরডিএর নোটিশ, হাইকোর্টের নির্দেশনা
ভবনমালিকদের ভাষ্য, মাহবুব আলীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আরডিএ ১৬ জুলাই ২০২৬ নির্মাণাধীন ভবনের মালিকপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। এতে ইমারত নির্মাণের নির্দিষ্ট শর্ত লঙ্ঘন ও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয়ের অভিযোগ তুলে সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের জন্য ৩ আগস্ট তাঁরা আরডিএতে সময় চেয়ে আবেদন করেন।
ভবনমালিকদের দাবি, তাঁরা নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করেছেন। পরে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে হাইকোর্ট আরডিএর নির্মাণকাজ বন্ধের নোটিশ এক মাসের জন্য স্থগিত করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু করার পরও মাহবুব আলী ও তাঁর লোকজন আবার নির্মাণকাজ বন্ধ করতে আসেন।
তবে ভবন নির্মাণে কোনো অনিয়ম হয়নি-এমন দাবির বিপরীতে আরডিএর নথি ও আদালতের আদেশের পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ অস্বীকার মাহবুবের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুব আলী বলেন, ভবন মালিকদের সঙ্গে তাঁর তেমন কোনো বিরোধ নেই। তাঁর দাবি, ভবনটি আরডিএর নিয়ম মেনে নির্মাণ করা হচ্ছে না। রাস্তার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা এবং এজমালি সম্পত্তির অংশও ছেড়ে দেওয়া হয়নি। এ কারণে তিনি আরডিএতে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তবে চাঁদা দাবির অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
জানতে চাইলে রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ বিষয়ে অনেক আগে অভিযোগ করা হয়েছিল। নথি না দেখে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। তবে থানায় কোনো অভিযোগ এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
