রাজশাহীতে ৭ দফা দাবিতে এআই টেকনিশিয়ানদের মানববন্ধন ও কর্মবিরতি
স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ এআই টেকনিশিয়ান কল্যাণ সমিতি, বৃহত্তর রাজশাহী জেলা শাখার উদ্যোগে ৭দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ও শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (৯ এপ্রিল) সকাল ১০টায় রাজশাহী জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের উপ-পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে এই কর্মসূচি পালিত হয়।
একই দাবিতে একযোগে রাজশাহীসহ নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও কর্মসূচি পালন করেন সংশ্লিষ্ট জেলার টেকনিশিয়ানরা।
মানববন্ধন কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন, রাজশাহীর সভাপতি-মাসুদ রানা। মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেন রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ জেলার মাঠকর্মী ও সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক।
সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা এআই টেকনিশিয়ানরা রাজশাহী জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র চত্বরে জড়ো হন। পরে তারা হাতে প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে অংশ নেন। ‘বকেয়া ভাতা চাই’, ‘চাকরি স্থায়ীকরণ চাই’, ‘ন্যায্য সম্মানী চাই’, ‘৭ দফা দাবি বাস্তবায়ন কর’— এমন বিভিন্ন স্লোগান লেখা ব্যানার দেখা যায় তাদের হাতে।
কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী টেকনিশিয়ানদের বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা। তারা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে বকেয়া সম্মানী ভাতা না পাওয়ায় তারা আর্থিক সংকটে ভুগছেন। তাছাড়া চাকরির নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জামের স্বল্পতা ও পেনশন সুবিধার মতো মৌলিক চাহিদাগুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। এসব কারণে তারা বাধ্য হয়ে এই আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ এআই টেকনিশিয়ান কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের ৭ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে:
১. দীর্ঘদিনের বকেয়া সম্মানী ভাতা অবিলম্বে পরিশোধ ২. চাকরির স্থায়ীকরণ ও নিয়মিতকরণ ৩. সম্মানজনক ও নিয়মিত মাসিক সম্মানী নির্ধারণ ৪. সরকারি স্বীকৃতি ও পরিচয়পত্র প্রদান ৫. অবসরের পর পেনশন বা অবসর ভাতা চালু ৬. পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা ৭. জাতীয় পর্যায়ে পেশাগত মর্যাদা ও নীতিমালা প্রণয়ন এই দাবিগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বকেয়া ভাতা পরিশোধ ও চাকরি স্থায়ীকরণের ওপর।
এদিন শুধু রাজশাহী নয়, পাশাপাশি নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও একই ধরনের মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। ওই সব জেলার সভাপতি ও নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে স্থানীয় এআই টেকনিশিয়ানরা একই দাবি তুলে ধরে আন্দোলনে অংশ নেন। এসব কর্মসূচি থেকে একই ঘোষণা দেওয়া হয় দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি চলবে।
নাটোরের এক টেকনিশিয়ান বলেন, “আমরা প্রায় ৮ বছর ধরে কাজ করছি, কিন্তু কোনো স্থায়ী পদে নিয়োগ হয়নি। শুধু চুক্তিভিত্তিক কাজ করিয়ে সরকার দায় এড়াতে পারে না।”
নওগাঁ জেলার সভাপতি বলেন, “আমরা পশুপালকদের ঘরে ঘরে গিয়ে সেবা দিই, দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে অবদান রাখি। অথচ আমাদের প্রতি সরকারের কোনো দায়িত্ববোধ দেখা যাচ্ছে না।”
কর্মসূচিতে বক্তারা প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় হতাশা প্রকাশ করেন। তারা জানান, এতগুলো জেলায় একযোগে কর্মসূচি পালিত হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আশ্বাস বা আলোচনার প্রস্তাব আসেনি।
একজন সংগঠক বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি। প্রশাসনের উচিত ছিল আমাদের ডেকে বসে সমাধানের পথ খোঁজা। কিন্তু তাদের নিরবতা আমাদের আন্দোলন আরও কঠোর করতে প্ররোচিত করছে।”
প্রসঙ্গত, কৃত্রিম প্রজনন টেকনিশিয়ানরা মাঠপর্যায়ে গবাদি পশুর কৃত্রিম প্রজনন, প্রাথমিক চিকিৎসা, পরামর্শ ও সচেতনতামূলক কাজ করেন। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই খাতের উন্নয়নে এআই টেকনিশিয়ানদের অবদান রয়েছে বহুলাংশে।
তাদের কর্মবিরতির ফলে মাঠপর্যায়ের সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে খামারিদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
একজন খামারি বলেন, “গাভী গরম হলে প্রজননের জন্য টেকনিশিয়ান দরকার হয়। এখন তারা না থাকায় আমরা বিপাকে পড়েছি।”
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ সরকারের প্রতি দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তারা বলেন, এ আন্দোলনের মাধ্যমে তারা কোনো বিশৃঙ্খলা চান না। তারা চান যৌক্তিক ও বাস্তবভিত্তিক সমাধান।
রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি বলেন, “আমরা কোনো সংঘর্ষ চাই না। শুধু চাই, সরকার আমাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান দিবেন। প্রয়োজনে আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত।” তিনি আরও জানান, দাবি আদায়ে প্রয়োজনে কেন্দ্রীয়ভাবে আরও বড় কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
সমিতির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, দাবি বাস্তবায়নে সরকার গড়িমসি করলে ঢাকামুখী আন্দোলনসহ পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তারা বলেন, “আমরা আর পিছিয়ে যাব না। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান চাই। দেশের মানুষের সেবায় কাজ করেই আমরা সম্মান ও নিরাপত্তা কামনা করি।”
এই আন্দোলনের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে এআই টেকনিশিয়ানরা আর নীরবে অন্যায় মেনে নেবেন না। তারা যেমন সেবাদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তেমনি নিজেদের অধিকার আদায়েও সচেতন। সরকারের উচিত দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা, যাতে করে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত কোনো বড় ধরনের সংকটে না পড়ে।
