গোদাগাড়ী প্রতিনিধি
এক সময় পদ্মার ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষা করতেন রিপা খাতুন। এখন সেই নদীর দিকে তাকালেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। যে পদ্মা তাঁর স্বামীকে কেড়ে নিয়েছে, সেই নদীই যেন রেখে গেছে দুই সন্তানকে নিয়ে এক অসহায় মায়ের দীর্ঘশ্বাস। স্বামীর মৃত্যুর পর জীবন থেমে যায়নি, তবে প্রতিটি দিনই তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে টিকে থাকার কঠিন লড়াই। পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া গ্রামের রিপা এখন অন্যের মিষ্টির দোকানে কাজ করেন। সারাদিনের শ্রমের বিনিময়ে পান মাত্র ১৫০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়ে সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো ছিল প্রায় অসম্ভব। এমন বাস্তবতায় ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ সহায়তা তাঁর সংসারে এনে দিয়েছে কিছুটা স্বস্তি। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বেড়পাড়া গ্রামে কথা হয় রিপা খাতুনের সাথে। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে রিপা খাতুন বলেন, আমি বিধবা।
সর্বনাশা পদ্মায় মাছ মারতে গিয়ে আমার স্বামী মারা গেছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর মিষ্টির দোকানে কাজ করে প্রতিদিন ১৫০ টাকা পাই। এই সামান্য আয়ে অভাবের সংসারে ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পেয়ে অনেক কাজে লাগছে। এখন ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ ও সংসার চালাতে সুবিধা হচ্ছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনেক ধন্যবাদ জানাই।’ প্রায় ১৫ বছর আগে গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী এলাকার রিপার বিয়ে হয় হরিপুর ইউনিয়নের জেলে সাঈদ আলীর সঙ্গে। সংসারে দুই সন্তান নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন তাঁরা। কিন্তু গত বছর হাইটেক পার্কের সামনে ডিঙ্গি নৌকায় মাছ ধরতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যান সাঈদ।
এরপর দুই সন্তানকে নিয়ে সংসারের ভার এসে পড়ে রিপার কাঁধে। সরকারি জায়গায় টিনের ছাপরা ঘরে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। বৃষ্টি নামলে ঘরের চাল ও বেড়া গড়িয়ে পানি ঢুকে পড়ে। কখনো ভিজে যায় ঘরের মেঝে, কখনো বই-খাতা। তবু সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করতে চান না রিপা। তাঁর ছেলে ইয়ামিন ভাটাপাড়া হাফেজিয়া মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়ে সাদিকা বেড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অভাবের সংসারে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্যামিলি কার্ডের সহায়তায় এখন সেই চাপ কিছুটা কমেছে।
শুধু রিপা নন, বেড়পাড়া গ্রামের আরও অনেক নিম্নআয়ের পরিবারের কাছেও এই সহায়তা হয়ে উঠেছে বাড়তি ভরসা। রিকশাচালক আজিম হোসেনের স্ত্রী নিলা বেগম বলেন, সংসারের খরচ চালাতে স্বামীর একার আয় যথেষ্ট হয় না। ফ্যামিলি কার্ডের টাকা তাঁদের প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করছে।
একই গ্রামের বেলাল হোসেনের স্ত্রী মানসুরা খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী রিকশা চালান। প্রতিদিন রিকশার জমার টাকা দেওয়ার পর হাতে যে টাকা থাকে, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পাওয়ায় সেই কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়েছে।
বেড়পাড়া এলাকার মাবিয়া খাতুনের তিন সন্তানও নানা সংকটের মধ্যে পড়াশোনা করছে। বড় ছেলে রমিম ইকবাল কসবা স্কুলে নবম শ্রেণিতে ও তামিম ইকবাল বেড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আরেক সন্তান ফাহিম ইকবাল ৪ বছর বয়স। সে রক্তের সমস্যায় ভুগছে; তিন মাস পরপর তাকে রক্ত দিতে হয়। সন্তানের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতেও ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবনুল আবেদীন বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। পবার হরিপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বেড়পাড়া, দবিরমোল্লাপাড়া ও দরগাপাড়া-এই তিন গ্রামের ৬৫৫টি পরিবার এ কার্ডের আওতায় এসেছে। গত মে মাস থেকে তাঁদের ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রতিটি পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ তাঁদের আর্থিক চাপ কমাতে সহায়তা করছে। প্রকৃত অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলো যাতে নিয়মিত এই সুবিধা পায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পদ্মার পাড়ের সেই টিনের ছাপরায় বসে তাই রিপার স্বপ্ন- ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা করে একদিন নিজেদের জীবন বদলাবে। স্বামী হারানোর শূন্যতা হয়তো কোনো সহায়তায় পূরণ হওয়ার নয়, কিন্তু ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ তাঁর কঠিন জীবনে দিয়েছে টিকে থাকার সামান্য শক্তি।
