রা জ শা হী র আ লোঃ – তশিকুল ইসলাম, নাচোল
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল সাব রেজিস্ট্রি অফিসে আওয়ামীলীগ নেতার মদদে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। ঐ আওয়ামীলীগ নেতা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি হওয়ায় দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে দলিল লেখক সমিতির অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বেপরোয়া চাঁদাবাজি ব্যাপকহারে বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে।
সরকার কে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এসব কর্মযোগ্য চলছে বলে ভুক্তভোগিরা জানান। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে। সমিতির সভাপতির হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা। দলিল লেখক সমিতির অনেকে ইতিমধ্যে অনিয়ম করে অঢ়েল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। উপজেলায় দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে গেলে সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে সমিতির নামে একটি নির্ধারিত হারে চাঁদা আদায় করছে।
জমি রেজিস্ট্রি যাবতীয় খরচের টাকা আদায়ও হচ্ছে সমিতির মাধ্যমে। সাধারণ দলিল লেখকরাও জিম্মি হয়ে পড়েছেন সমিতির নেতাদের কাছে। তারা সমিতির বাইরে গিয়ে কোনো দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারছেন না। রেজিস্ট্রি অফিসকে জিম্মি করে সরকারি নির্ধারিত ফিসের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে সমিতি।
সাধারণ ও নিরীহ মানুষ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে জমি/দলিল রেজিস্ট্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। জমির ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জিম্মি করে আদায়কৃত টাকা ভাগ করে নিচ্ছেন সমিতির নেতারা থেকে শুরু করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসার পর্যন্ত। দলিল লেখক সমিতির চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহাই পেতে অবশেষে ৯ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা রেজিস্টার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগি কয়েকজন দলিল গ্রহীতা।
ভুক্তভোগি দলিল গ্রহীতা নাচোল উপজেলার গনইর গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে আ:কাদের ও শিবগঞ্জ উপজেলার চরপাকা গ্রামের মুশাহাক আলীর ছেলে মিজানুর রহমান জানান,গত ১৯ জানুয়ারি ২২ইং নাচোল সাবরেজিস্ট্রি অফিসে তিনটি খোস কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করতে গেলে দলিল লেখক নুহু আলম রেজিস্ট্রি খরচ ও তার ফি বাবদ ছাড়ায় অতিরিক্ত দলিল প্রতি ৫০০০/টাকা করে চাঁদা দলিল সমিতির সভাপতি আবুল হোসেনের নামে আমাদের কাছে আদায় করে।আমরা কিছু বলতে গেলে তারা দলিল আটকিয়ে দেওয়ার হুমকি দেখায়। আমরা নায্য বিচারের আশায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি।
এছাড়া ভুক্তভোগি দলিল গ্রহীতা নাচোল হাজীডাঙ্গা গ্রামের কাইয়ুম আলীর ছেলে সুলতান আলী জেম অভিযোগ করে বলেন,আমি গত ১৯ জানুয়ারি ২২ইং নাচোল সাবরেজিস্ট্রি অফিসে একটি দলিল রেজিস্ট্রি করতে গেলে দলিল লেখক জামাল রেজিস্ট্রি খরচ ও তার ফি বাবদ ছাড়ায় অতিরিক্ত দলিল প্রতি ৫০০০/টাকা করে চাঁদা দলিল সমিতির সভাপতি আবুল হোসেনের নামে আমাদের কাছে আদায় করে। আমি অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন সহ অন্য দলিল লেখকরা আমার সাথে সন্ত্রাসী আচারণ করে।
অপরদিকে ভুক্তভোগি নাচোল উপজেলার বেনীপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে বশির জানান, জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে আমি নাচোল সাবরেজিস্ট্রি অফিসে একটি দলিল রেজিস্ট্রি করতে গেলে দলিল লেখক শওকত আলী রেজিস্ট্রি খরচ ও তার ফি বাবদ ছাড়া অতিরিক্ত দলিল প্রতি ৫০০০/টাকা করে চাঁদা দলিল সমিতির নামে আদায় করে।চাঁদা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে সমিতির লোকজন আমাকে নানা ভয়ভীতি দেখায়।
বশির আরো জানান, এসব চাঁদা আদায়ের পেছনে নাচোল উপজেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন সরাসরি জড়িত।তিনি আওয়ামীলীগের পদবি ব্যবহার করে চাঁদা আদায়ের রামরাজত্ব কায়েম করছেন।
অনুসন্ধানে আরো জানাগেছে, সমিতির গোপনীয় একটি সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করার পরই দলিল যায় সাব-রেজিস্ট্রারের টেবিলে।সেখানেও প্রতি টেবিলে দলিল প্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা এবং ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন ও কাগজের ত্রুটি থাকলে সংশ্লিষ্ট করণিকের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে প্রকারভেদে আদায় করেন লাখ টাকা পর্যন্ত।
উপজেলা আ’লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল হোসেন দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি সেজে চাঁদা আদায়ে মূখ্য ভূমিকা পালন করছে এমনটাই বলছেন ভুক্তভোগী ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক। আরও জানা যায়, দলিল লেখক সমিতিতে সনদপ্রাপ্ত দলিল লেখক রয়েছেন প্রায় ৬৫ জন।
আইন অনুযায়ী দলিল লেখকরা দলিল লেখার বিনিময়ে প্রতি পৃষ্ঠা বাবদ ও সরকারি ফি’র হার নির্ধারণ করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে একটি করে তালিকা টানিয়ে রাখার নির্দেশনা রয়েছে।কিন্তু এসবের বালাই নাই দলিল লেখক সমিতিতে।
নাচোল সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আমিনুল ইসলাম জানান,নাচোল সাব রেজিস্ট্রি অফিসে কোন দলিল লেখক সমিতি নাই। অলিখিত ভাবে কিছু লোক এ গুলা করছে।
এবিষয়ে নাচোল সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক নুহু আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,আঃকাদের ও মিজানুর রহমান জমি রেজিস্ট্রির দিন সরাসরি আমাকে টাকা দেয়নি,তারা তাঁর চাচার মাধ্যমে হয়ত টাকা দিয়েছে।
এবিষয়ে নাচোল সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক জামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি শুধু আমার লেখনির টাকা নিয়েছি।
এ বিষয়ে নাচোল উপজেলা আ’লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার নাম করে কেউ চাঁদা আদায় করছে,যা আমি জানিনা। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
এবিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার আলী আকবরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, লিখিত আভিযোগ পেয়েছি, তদন্ত চলছে,তদন্তে আনিত অভিযোগ প্রমানিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
