সম্পাদকীয়: সম্প্রতি ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, যা উদ্বেগজনক। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বিভিন্ন ব্যাংকে ২৭ হাজারেরও বেশি টাকার তারল্য হ্রাসের কয়েকটি কারণ শনাক্ত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জানা গেছে, এসবের বাইরেও ব্যাংক খাতে তারল্য হ্রাসের কিছু কারণ রয়েছে। এর অন্যতম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু গুজব। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংক খাতে তারল্যের জোগান স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নগদ টাকার জোগান বাড়ানো হয়েছে।
ব্যাংকে তারল্য বাড়ে-কমে, এটি স্বাভাবিক এক প্রক্রিয়া। তবে সাম্প্রতিক তারল্য হ্রাসের বিষয়টি স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এ ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কোনো কিছুর আভাস পাওয়া গেলে তা আমলে নিতে হবে। করোনার আঘাতের পর দেশে অর্থনীতি যখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার দিকে যাচ্ছিল, তখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবসহ আরও কিছু বিষয় দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব বাস্তবতার কারণে ২০২৩ সালে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অস্থিরতার বিষয়টি ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। এসব সংকটের সঙ্গে আলোচ্য তারল্য সংকটের সম্পর্ক আছে কিনা, খতিয়ে দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধিতে দেশের বিনিয়োগে প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে বাড়তি প্রবৃদ্ধিতে নানা প্রশ্ন দেখা দেওয়া স্বাভাবিক।
ঋণের সঠিক ব্যবহার নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। এসব ক্ষেত্রে সতর্ক না হলে ঋণের অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ‘ব্যাংক খাতে কিছু সংকট সৃষ্টি হয়েছে’। এ ধরনের গুজবের শিকার হয়ে ব্যাংক থেকে অনেকে টাকা তুলে নিয়েছেন, যা নজিরবিহীন। যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় নন, এ গুজব তাদেরও স্পর্শ করেছে। আমরা জানি, তথ্য নিয়ন্ত্রণ বা তথ্য গোপনের প্রবণতা থেকেই গুজবের সূত্রপাত হয়। আলোচ্য ক্ষেত্রে যেহেতু গুজবের মাত্রাটি তীব্র ছিল, সেহেতু এর উৎস খুঁজে বের করা দরকার।
ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট বাড়লে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে হয়তো এর বড় প্রভাব পড়ে না, কিন্তু এতে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের যে ক্ষতি হয়, তা পূরণের উপায় কী? ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়ে কোনো গ্রাহককে যাতে খালি হাতে ফেরত যেতে না হয়, সেদিকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দৃষ্টি দিতে হবে। কোনো গ্রাহক টাকা তুলতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হলে গুজবের ডালপালা আরও বাড়তে পারে। দেশে আগামী দিনের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নেবে, সেসব তথ্য যাতে সাধারণ মানুষও সহজে জানতে পারে সে জন্য উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
ব্যাংক খাতে গুজব সৃষ্টিকারীরা এমন একটি সময় বেছে নিয়েছে যখন ‘মূল্যস্ফীতি’, ‘খাদ্য নিরাপত্তা’-এ বিষয়গুলো বিশেষ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কেবল ব্যাংক খাতে নয়, অর্থনীতির অন্যান্য উপখাতে গুজব সৃষ্টিকারীরা যাতে সফল হতে না পারে, সে জন্য আস্থার সংকট দূর করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপও নিতে হবে।
কারা কী উদ্দেশ্যে এ গুজব ছড়িয়েছিল তা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংক খাতের সুরক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্বিক নজরদারি আরও বাড়াতে হবে; কোনো সংকট সৃষ্টি হলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
