স্টাফ রিপোর্টার
সবুজে সবুজে ছেঁয়ে দিয়ে জীবনকে সবুজ আর প্রাণবন্ত করতে সরকার ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপনের কর্মসূচী হাতে নিয়েছে, আর এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে উৎসব মুখর কর্মব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছেন সামাজিক, রাজনৈতিক, সরকারি, বেসরকারি সহ দেশের আপামর মানুষ। ঠিক এমন-ই সময় খোঁড়া যুক্তিতে রাজশাহীতে এক সরকারি অফিস চত্বর থেকে প্রায় ১২ বছর বয়সের একটি পাইকড় গাছের প্রাণ কেড়ে নিল ঐ সরকারি দপ্তরেরই কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
“একজন মানুষ গাছের নিচে বসে বাঁশ কেটে কবরস্থানের চ্যাগার তৈরি করতেন, এমন অভিযোগের জেরেই প্রায় ১২ বছর বয়সী পাইকর গাছ কেটে ফেলা হয়েছে”- এমন-ই অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী জেলা সমাজসেবা কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে।
তাহলে একজনকে সরাতে একটি বড় গাছ কেটে ফেলাই কি ছিল একমাত্র সমাধান? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কাঠা জায়গাজুড়ে সবজি, কলা ও আখ চাষ করা হচ্ছে। এর পাশেই ছিল ছায়াদানকারী পাইকর গাছটি। তবে গাছটির ডালপালা ও পাতা নেই; কেটে ফেলার পর পড়ে আছে শুধু অবশিষ্ট অংশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমপ্লেক্সের এক কর্মচারীর বলেন, অফিস সহকারী মুঞ্জুরুল ইসলাম ওই খালি জায়গায় চাষাবাদ করছেন। উৎপাদিত সবজির কিছু অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া হলেও অধিকাংশ বাজারে বিক্রি করা হয়। তবে এ অভিযোগ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গাছ কাটার বিষয়ে অফিস সহকারী মুঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় একজন ব্যক্তি গাছের নিচে জায়গা দখল করে বাঁশ কাটতেন। নিষেধ করেও তিনি না শোনায় গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। গাছ না কেটে অন্য কোনভাবে এসমস্যার সমাধান করা যেত কিনা এমন প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
এ বিষয়ে সমাজসেবা কমপ্লেক্সের উপ-পরিচালক মনিরা খাতুন বলেন, বাইরের লোকজন গাছের নিচে বসবে কেন? পরে গাছ কাটার বিষয়টি তাঁর জানা নেই জানিয়ে তিনি বলেন,জেনে জানাব।
এতেই প্রশ্ন উঠেছে বাইরের কেউ অনুমতি ছাড়া সেখানে বসে থাকলে তাকে সরাতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? প্রয়োজনে নিরাপত্তাকর্মী কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও গাছ কাটার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, গাছটি কাটার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি-না?
সরকারের নেয়া বৃক্ষরোপন কর্মসূচিকে সফল করতে রাজশাহীতে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ৯৩ হাজার ২০০টি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এমন সময়ে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছায়াদানকারী গাছ কেটে ফেলার অভিযোগে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি গাছ কাটার ঘটনা তাই শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং সরকারি জায়গার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন জড়িত। বিষয়টি তদন্ত করে গাছ কাটার অনুমোদন ও চাষাবাদের বৈধতা স্পষ্ট করার দাবি তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এ বিষয়ে বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন,একজন মানুষকে সরানোর জন্য একটি পরিণত গাছ কেটে ফেলা আমাদের পরিবেশ-চেতনার গভীর সংকটকে প্রকাশ করে। এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। মানুষটিকে সরানোর ভিন্ন মানবিক পদ্ধতি অবলম্বন করা যেত কিন্তু তা না করে তারা গাছ কেটে এর সমাধান করার চেষ্টা করেছে। মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত না করা গেলে টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীল নগর গঠন সম্ভব নয়। এটি করতে হলে আগে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চিন্তা চেতনার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
